সময়, স্মৃতি ও মানব চেতনা নিয়ে অলিভার স্যাক্স ও চিন্তাবিদদের ভাবনা

Published: October 25, 2026, 2:52 am

সময় কী—এই প্রশ্নের উত্তরে আর্জেন্টিনার খ্যাতনামা লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেস একদা লিখেছিলেন, সময়ই সেই মূল উপাদান যা দিয়ে তিনি নিজে তৈরি। সময়কে তিনি এমন এক নদী হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন যা তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, আবার একই সঙ্গে তিনি নিজেই সেই নদী। আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও এই ভাবনার গভীরে লুকিয়ে রয়েছে এক বিশাল রহস্য। মানুষের চিন্তাভাবনা, কাজকর্ম, অনুভূতি ও চলাফেরা—সবকিছুই সময়ের সীমানায় ঘটে এবং চেতনার প্রতিটি বিস্তারও সময়ের সঙ্গেই প্রসারিত হয়। মানুষ সময়ের মধ্যে বাস করে সময় মেপে জীবন পরিচালনা করে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, চেতনা বা অভিজ্ঞতার এই সময় কি সত্যিই একটি নদীর মতো অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হয়, নাকি এটি সুতোয় গাঁথা পুঁতির মতো আলাদা আলাদা বিচ্ছিন্ন মুহূর্তের একটি সমষ্টি?

আঠারো শতকের দার্শনিক ডেভিড হিউম মনে করতেন, মানুষের মন মূলত নানাবিধ অভিজ্ঞতার সমষ্টি, যেখানে একের পর এক উপলব্ধি অবিশ্বাস্য দ্রুততায় আবির্ভূত হয় এবং মন সর্বদা পরিবর্তনশীল থাকে। তবে উনিশ শতকের শেষে মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম জেমস এই চিন্তায় একটি মৌলিক জটিলতা খুঁজে পান। মন যদি বিচ্ছিন্ন মুহূর্তের সমষ্টিই হবে, তবে আমাদের অভিজ্ঞতা এত নিরবচ্ছিন্ন মনে হয় কেন? সচরাচর কোনো দৃশ্য বা চিন্তার মাঝে পর্দা নামার মতো বিচ্ছেদ মানুষ অনুভব করে না। জেমস একেই ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’ বা চেতনার প্রবাহ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর মতে, চিন্তা ক্রমাগত বদলালেও তার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে উনিশ শতকের জনপ্রিয় খেলনা ‘জোট্রোপ’-এর উদাহরণ টানা যায়। ড্রামের মতো দেখতে এই যন্ত্রের গায়ে একটি প্রাণীর দৌড়ানো বা মানুষের লাফানোর ধারাবাহিক স্থির ছবি আঁকা থাকত। ড্রামটি দ্রুত ঘোরালে স্থির ছবিগুলো আলাদা না থেকে একটি চলমান দৃশ্যের রূপ নিত। গতি আসলে ছবিতে ছিল না, ছিল মানুষের দেখার অভিজ্ঞতায়। মস্তিষ্কের কাজও হয়তো অনেকটা এমন। জেমস যদি কয়েক বছর পর লিখতেন, তবে তিনি চলচ্চিত্রে চিত্রধারণের উদাহরণ দিতেন। সিনেমায় প্রতিটি ফ্রেম স্থির হলেও পর্দায় চলমান গাড়ি, নদী বা বৃষ্টি দেখা যায়। ক্যামেরার জুম, দৃশ্য পরিবর্তন ও স্মৃতির উপস্থিতি যেন চেতনার কাজেরই প্রতিচ্ছবি। ১৯০৭ সালে প্রকাশিত ‘ক্রিয়েটিভ ইভল্যুশন’ বইয়ে দার্শনিক অঁরি বের্গসনও চিন্তার সঙ্গে চলচ্চিত্রের তুলনা করেছিলেন। তাঁর মতে, মুহূর্তগুলো একটির ভেতর আরেকটি প্রবেশ করে মিশে যায়, ঠিক যেমন আলাদা সুরের নোট মিলে একটি সংগীত তৈরি করে এবং আগের নোটের স্মৃতি পরের সুরকে অর্থ জোগায়। জেমসের মতে, বর্তমানের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সর্বদাই অতীতের স্মৃতি এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশা মিশে থাকে। কোনো পরিচিত মুখ দেখলে শুধু মুখটিই ভেসে ওঠে না, তার সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য স্মৃতি ও অনুভূতিও নতুন উপলব্ধি তৈরি করে।

যদি মানুষের চেতনা সত্যিই বিচ্ছিন্ন মুহূর্তের মালা হতো এবং প্রতিটি মুহূর্ত চিরতরে হারিয়ে যেত, তবে অতীতের কোনো জ্ঞান অবশিষ্ট থাকত না। কারো পক্ষে কোনো অভিজ্ঞতা থেকে শেখা, স্বজনকে চিনে রাখা কিংবা নিজের অস্তিত্বকে বোঝা অসম্ভব হয়ে উঠত। চিকিৎসাজীবনে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ অলিভার স্যাক্স এমন রোগীদের মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর লেখা ‘দ্য ম্যান হু মিস্টুক হিজ ওয়াইফ ফর আ হ্যাট’ বইয়ে উল্লেখিত জিমি নামের এক রোগী স্মৃতিভ্রংশের কারণে একটি মাত্র মুহূর্তের মধ্যে আটকে ছিলেন। চারপাশের পরিবেশ বদলালেও নতুন অভিজ্ঞতাকে অতীতের সঙ্গে যুক্ত করে জীবনের ধারাবাহিকতা গড়ার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। তাঁর জীবন ছিল এক স্থির বর্তমান, যার পেছনে স্মৃতিময় অতীত বা সামনে কল্পনাযোগ্য কোনো ভবিষ্যৎ ছিল না।

মাইগ্রেনের আক্রমণের সময়ও চেতনার এই ধারাবাহিকতায় ছন্দপতন ঘটে। ১৯৭০ সালে মাইগ্রেন নিয়ে লেখা বইয়ে স্যাক্স এই অভিজ্ঞতার নাম দিয়েছিলেন ‘সিনেমাটোগ্রাফিক ভিশন’ বা চলচ্চিত্রের মতো দৃষ্টি। সেখানে রোগীদের কাছে চলমান পৃথিবী হঠাৎ স্থির ছবির ধারায় ভেঙে যেত এবং মানুষের চলাচল মসৃণ না হয়ে ধীরগতির সিনেমার মতো মনে হতো। একইভাবে এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের প্রদাহের পর দীর্ঘদিন স্নায়বিক সমস্যায় ভোগা রোগীদের লেভোডোপা (L-Dopa) ওষুধ দেওয়ার পর সাময়িকভাবে চেতনার প্রবাহ থমকে যাওয়ার ঘটনা দেখা গেছে। হেস্টার ওয়াই নামের এক রোগীর বাথরুমে পানি উপচে পড়লেও তিনি ঘরের মাঝখানে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। গোসলের শুরুতে পাত্রে মাত্র এক ইঞ্চি পানি জমে থাকার দৃশ্যটি তাঁর মস্তিষ্কে স্থির হয়ে গিয়েছিল, যার ফলে সময় পার হলেও তিনি বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পারেননি। এটি প্রমাণ করে যে স্বয়ংক্রিয় শারীরবৃত্তীয় কাজ চালু থাকলেও সচেতন অভিজ্ঞতার প্রবাহ দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে যেতে পারে।

চোখের দৃষ্টির সাধারণ বিভ্রমও মস্তিষ্কের ব্যাখ্যাধর্মী কাজের ইঙ্গিত দেয়। নেকার ঘনকের রেখাচিত্র দেখলে চোখের প্রতিচ্ছবি না বদলালেও মস্তিষ্কের ব্যাখ্যার কারণে ঘনকের সামনের ও পেছনের অবস্থান বারবার বদলে যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় কয়েক সেকেন্ড পর পর এই পরিবর্তন ঘটলেও কিছু স্নায়বিক রোগীর ক্ষেত্রে দৃশ্যটি দীর্ঘ সময় অপরিবর্তিত থাকে। ঘুরন্ত পাখা বা গাড়ির চাকা স্থির কিংবা উল্টো দিকে ঘুরছে বলে মনে হওয়ার বিভ্রম নিয়ে স্নায়ুবিজ্ঞানী ডেল পারভস ও তাঁর সহকর্মীরা গবেষণা করেছেন। তাঁদের মতে, মানুষের দৃষ্টিব্যবস্থা ধারাবাহিক ছোট ছোট পর্বে তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে এবং স্বাভাবিক অবস্থায় তা এত দ্রুত জোড়া লাগে যে মানুষ কোনো বিচ্ছেদ বোঝে না। তবে স্নায়ুকোষের বৈদ্যুতিক ক্রিয়া কীভাবে নীল রং দেখা, গভীরতা বা গতির প্রত্যক্ষ সচেতন অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়, তা এখনো গবেষণার অন্যতম জটিল প্রশ্ন।

বর্তমানে মস্তিষ্কের প্রায় একশ বিলিয়ন স্নায়ুকোষ এবং তাদের মধ্যকার যোগাযোগের ওপর ভিত্তি করে স্নায়ুবিজ্ঞান নতুনভাবে এগোচ্ছে। স্নায়ুবিজ্ঞানী জেরাল্ড এডেলম্যান এই প্রক্রিয়া বোঝাতে ‘নিউরাল ডারউইনিজম’ বা স্নায়বিক ডারউইনিজম ধারণাটি ব্যবহার করেছিলেন। মানুষের অভিজ্ঞতা ও নতুন শিক্ষার ফলে মস্তিষ্কের কিছু স্নায়বিক সংযোগ শক্তিশালী হয় এবং কিছু দুর্বল হয়। অর্থাৎ মস্তিষ্ক কোনো জন্মগত স্থির যন্ত্র নয়, বরং অভিজ্ঞতার আলোকে প্রতিনিয়ত নিজেকে পুনর্গঠন করে। বিবর্তনের দিক থেকেও এই ক্ষমতার গুরুত্ব অপরিসীম। জঙ্গলে গর্জন শোনা, বাতাসের দিক পরিবর্তন ও আলো কমে যাওয়ার ঘটনাকে স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে কোনো প্রাণী যেভাবে সম্ভাব্য বিপদ থেকে বাঁচতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, মানুষও তেমনি সচেতনতাকে কাজে লাগিয়ে ভাষা, আত্মসচেতনতা, অতীত স্মরণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজস্ব জীবনকাহিনি গড়ে তোলে।

লেখক ক্রিস্টোফার ইশারউড নিজেকে নিরপেক্ষ ক্যামেরার সঙ্গে তুলনা করলেও মানুষের চেতনা মোটেও নিরপেক্ষ ক্যামেরা নয়। ক্যাফেতে বসে থাকার সময় চারপাশের অজস্র ঘটনার মধ্য থেকে মন কেবল নির্দিষ্ট কিছু দৃশ্য বেছে নেয়, যার পেছনে কাজ করে ব্যক্তিগত স্মৃতি, আবেগ ও প্রত্যাশা। উইলিয়াম জেমসের মতে, প্রতিটি চিন্তা আগের চিন্তার কিছু না কিছু অংশ বহন করে পরের চিন্তায় পৌঁছে দেয় এবং প্রতিটি ভাবনার সঙ্গে মানুষের আত্মপরিচয়ের ছাপ যুক্ত থাকে। প্রখ্যাত ফরাসি লেখক মার্সেল প্রুস্তের মতে, মানুষ হলো মুহূর্তের এক সংগ্রহ, যেখানে মুহূর্তগুলো একে অপরের সঙ্গে মিশে নদীর জলের মতো প্রবহমান থাকে। নদী বয়ে চললেও তার নাম যেমন অপরিবর্তিত থাকে, মানুষও প্রতিনিয়ত বদলে গিয়েও নিজেকে একই সত্তা হিসেবে অনুভব করে।

উল্লেখ্য, অলিভার স্যাক্স (১৯৩৩–২০১৫) ছিলেন একজন প্রখ্যাত ব্রিটিশ স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ও লেখক। মস্তিষ্কের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিবর্তন কীভাবে মানুষের ব্যক্তিত্ব, অনুভূতি ও জীবনের ওপর প্রভাব ফেলে, তা তিনি গবেষণার পাশাপাশি সাহিত্যরস দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। চেতনার এই নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের মধ্যেই মানুষ সময়ের সাথে বদলায় এবং প্রতিদিন নিজের অস্তিত্বকে খুঁজে পায়।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin