ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমছে, মহাবিপর্যয়ের ঝুঁকিতে রাজধানী

Published: October 24, 2026, 6:40 am

রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থাপনা বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট এবং মাত্রাতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে প্রতি বছর ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতির কারণে ঢাকার কেন্দ্রস্থল থেকে টঙ্গী, সাভার, ধামরাই, দোহার ও নবাবগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে একটি ভয়ংকর শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যাকে ভূতাত্ত্বিক ভাষায় 'কম্পাউন্ড কোন অব ডিপ্রেশন' বলা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে রাজধানী ঢাকা মারাত্মক ভূমিধস ও ভয়াবহ পানিশূন্যতার কবলে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিগত ৬০ বছরের পর্যবেক্ষণ বলছে, অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে ঢাকার পানির স্তর প্রতি বছর গড়ে ২ মিটার বা প্রায় ৭ ফুট করে নিচে নামছে। এদিকে সারা দেশে ১ হাজার ২৭২টি (২৭২ট) পর্যবেক্ষণ কূপের মাধ্যমে ৬০ বছর ধরে পানির পরিমাণ ও গুণমান পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ১৯৭০ সালে ঢাকা শহরে মাত্র ৬ মিটার বা ২০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা ৭৩ মিটার বা ২৪০ ফুটের নিচে নেমে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক ও ভূগর্ভস্থ পানি বিশেষজ্ঞ ড. আনোয়ার জাহিদ জানান, মাটির নিচে একটি বড় বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে যা সরাসরি দৃশ্যমান নয়, তবে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে এর ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়। তিনি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ভূগর্ভস্থ পানি কমিশন’ গঠনের তাগিদ দিয়েছেন।

ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, নগরীর প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন ৩৩ লাখ ঘনমিটার ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করতে হয়। এই নির্ভরতা কমাতে মেঘনা নদী পানি শোধনাগার এবং সায়েদাবাদ পানি শোধনাগারের (ফেইস-৩) মতো প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও দীর্ঘসূত্রতায় সেগুলোর অগ্রগতি ধীর। ২০১৩ সালের ডিইএসডব্লিউএস প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হলেও কাজ শেষ হয়নি। এছাড়া ২০১৫ সালে শুরু হওয়া সায়েদাবাদ প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ, যেখানে ব্যয় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পেরে ঢাকা ওয়াসা পুনরায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়িয়ে নতুন করে ৯২০ কোটি ৮৫ লাখ টাকার একটি জরুরি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩৮৮টি গভীর নলকূপ প্রতিস্থাপনসহ নানা অবকাঠামোগত কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ওয়াসার এই উদ্যোগকে পানি ও নগর বিশেষজ্ঞরা ‘আত্মঘাতী’ এবং ‘বুমেরাং’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বড় প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ না করে নতুন নলকূপ বসানো সরকারিভাবে অবৈধ পানি উত্তোলনের স্বীকৃতি দেওয়ার শামিল, যা মাটির নিচের পরিবেশকে আরও বিপন্ন করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য নতুন পাম্প বসানো বন্ধ করা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা, পাইপলাইনের পানির ২৫ শতাংশ অপচয় রোধ এবং ‘বাংলাদেশ পানি আইন’ কঠোরভাবে কার্যকর করে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

বিকল্প ভূ-উপরিস্থ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পেরে ঢাকা ওয়াসা বাধ্য হয়ে পুনরায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। এজন্য নেওয়া হয়েছে ৯২০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প। ভূগর্ভ থেকে দৈনিক আরো ৫৭৬ মিলিয়ন লিটার পানি উত্তোলনের জন্য ৯২০ কোটি ৮৫ লাখ টাকার এ নতুন জরুরি প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

একনেকে অনুমোদন পেলে ২০৩০ সালের মধ্যে এটি বাস্তবায়িত হওয়ার কথা রয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩৮৮টি গভীর নলকূপ প্রতিস্থাপন, ৪৫০ সেট পাম্প মোটর সেট সরবরাহ ও স্থাপন, নতুন করে ৬২টি গভীর নলকূপ, ৪৫০টি ভ্যারিয়েবল ফ্রিকোয়েন্স সরবরাহ ও স্থাপন, ৪৮০ সেট পাম্প ডেলিভারি লাইন স্থাপন, ২৫০টি পাম্প ঘর, ২৮০ গভীর নলকূপ রি-জেনারেশন, ১২৪টি স্ক্যাডা সিস্টেম স্থাপন ও ৬০টি গভীর নলকূপ রি-হ্যাবিলিটেশন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া প্রকল্প কার্যক্রমে থাকছে বৈদ্যুতিক কেবল সরবরাহ, কলাম পাইপ সরবরাহ, বাউন্ডারি ওয়ালসহ অন্যান্য নির্মাণ কার্যক্রম।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin