খলিফা ওমর (রা.)-এর শাসনামলে প্রবর্তিত অর্থনৈতিক কাঠামো ও শুল্ক ব্যবস্থা আধুনিক বাণিজ্যনীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথ সুগম করা এবং দেশীয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে তিনি 'ওশর' নামক একটি বিশেষ বাণিজ্যিক শুল্ক ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। এই নীতি অনুযায়ী, বিদেশি অমুসলিম ব্যবসায়ীরা মদিনার বাজারে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতেন। অমুসলিম জিম্মি নাগরিকদের জন্য এই হার ছিল ৫ শতাংশ এবং মুসলিম ব্যবসায়ীদের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তা ছিল মাত্র আড়াই শতাংশ। এই সুবিন্যস্ত কাঠামো অভ্যন্তরীণ উৎপাদকদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
খলিফা ওমর (রা.) ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে অত্যন্ত মানবিক ও নমনীয় অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রবর্তন করেছিলেন। তিনি নির্দেশনা জারি করেছিলেন যে, কোনো বিদেশি ব্যবসায়ী যদি ২০০ দিরহামের কম মূল্যের পণ্য নিয়ে বাজারে আসেন, তবে তার ওপর কোনো সীমান্ত শুল্ক আরোপ করা যাবে না। এছাড়া, যদি কোনো ব্যবসায়ী তার পণ্য বিক্রি করতে না পেরে তা নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে চাইতেন, তবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তার জমা দেওয়া শুল্কের সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত দেওয়ার নিয়ম ছিল। ইমাম আবু ইউসুফের ‘কিতাবুল খারাজ’ গ্রন্থে এই নীতিকে মুক্তবাণিজ্যের এক উদার প্রবেশদ্বার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তার বিনিময়ে ধার্য করা জিজিয়া করের ক্ষেত্রেও খলিফা ওমর (রা.) মানবিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং অক্ষম ব্যক্তিদের এই কর থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। ইমাম আবু উবাইদ কাসিম বিন সালামের ‘কিতাবুল আমওয়াল’ অনুযায়ী, এক বৃদ্ধ ও অন্ধ অমুসলিম নাগরিককে ভিক্ষা করতে দেখে খলিফা অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং সরকারি কোষাগার থেকে তার আজীবন ভাতার ব্যবস্থা করেন। এছাড়া, যুদ্ধের কারণে রাষ্ট্র অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলে সংগৃহীত কর ফেরত দেওয়ার নজিরও রয়েছে। সিরিয়া যুদ্ধের সময় হিমস শহর থেকে মুসলিম বাহিনী সরে আসার সময় সেনাপতি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.) স্থানীয় অমুসলিমদের লক্ষাধিক দিরহাম কর ফেরত দিয়েছিলেন, যা ইতিহাসে এক অনন্য ইনসাফের উদাহরণ।
বাজার ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা বজায় রাখতে খলিফা ওমর (রা.) ‘হিসবাহ’ বা বাজার পরিদর্শক ব্যবস্থা চালু করেন। তিনি প্রখ্যাত নারী সাহাবি হজরত শিফা বিনতে আবদুল্লাহ (রা.)-কে মদিনার মূল বাজার পরিদর্শনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। খলিফা নিজে বাজার পরিদর্শনের সময় ব্যবসায়ীদের সুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করতেন এবং জালিয়াতি রোধে সরাসরি নগদ লেনদেনের ওপর গুরুত্বারোপ করতেন। এছাড়া অতিরিক্ত মুনাফার উদ্দেশ্যে পণ্য মজুত বা কালোবাজারি করা তিনি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন।





