বিশ্বজুড়ে কোটি দর্শকের কাছে তিনি ‘ড্রাগনের মা’ হিসেবে পরিচিত। তবে পর্দার কাল্পনিক সাম্রাজ্য জয়ের চেয়েও বড় সংগ্রাম এমিলিয়া ক্লার্ককে করতে হয়েছিল নিজের জীবন বাঁচাতে। মাত্র ২২ বছর বয়সে, যখন তাঁর অভিনীত ফ্যান্টাসি সিরিজ ‘গেম অব থ্রোনস’ বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি করছে, তখনই আচমকা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে (ব্রেন হেমারেজ) আক্রান্ত হন তিনি। এর ঠিক দুই বছর পর, ২৪ বছর বয়সে আবারও দ্বিতীয়বারের মতো একই ধরনের প্রাণঘাতী শারীরিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হন তিনি। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২৩ অক্টোবর ৪০ বছরে পা রাখলেন এই ব্রিটিশ অভিনেত্রী। ১৯৮৬ সালের এই দিনে লন্ডনে জন্ম নেওয়া এমিলিয়া আজ প্রায় ১৫ বছর পর স্মৃতির পাতা উল্টে বলেন, ‘বেঁচে যাওয়াই যথেষ্ট নয়, সুস্থ হয়ে ওঠাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।’
এমিলিয়ার পুরো নাম এমিলিয়া ইসোবেল ইউফেমিয়া রোজ ক্লার্ক। থিয়েটারের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার বাবা পিটার ক্লার্ক এবং ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের বিপণন বিভাগে কর্মরত মা জেনিফার ডড ক্লার্কের সংসারে ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক পরিবেশ পান তিনি। ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডশায়ারে বেড়ে ওঠা এমিলিয়া মাত্র তিন বছর বয়সে ‘শো বোট’ মঞ্চনাটক দেখে অভিনয়ের প্রতি অনুরাগী হন। স্কুলজীবন থেকেই নাটকে অভিনয় শুরু করা এমিলিয়া পড়াশোনা শেষ করেন লন্ডনের ড্রামা সেন্টারে। ২০০৯ সালে পড়ালেখা শেষে বিবিসি-র চিকিৎসাবিষয়ক ধারাবাহিক ‘ডক্টরস’-এ ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করে টেলিভিশনে তাঁর পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু হয়। সে সময় জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁকে টুকটাক নানা কাজ করতে হলেও তিনি একটি বড় সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন।
সেই কাঙ্ক্ষিত সুযোগটি আসে ২০১১ সালে ‘গেম অব থ্রোনস’ সিরিজের মাধ্যমে। জর্জ আর আর মার্টিনের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এইচবিওর এই সিরিজে ‘ডেনেরিস টারগারিয়েন’ চরিত্রে অভিনয় করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পান এমিলিয়া। সাদা চুলের ড্রাগনের মা হিসেবে ক্ষমতা, ভালোবাসা ও প্রতিশোধের জটিল বিবর্তন পর্দায় ফুটিয়ে তুলে ২০১১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আটটি মৌসুমে অভিনয় করেন তিনি। এই চরিত্রের জন্য চারবার প্রাইমটাইম এমি পুরস্কারের মনোনয়ন পান, যার মধ্যে ২০১৯ সালে ছিল সেরা অভিনেত্রী বিভাগের মনোনয়ন। এরপর একে একে ‘টার্মিনেটর জেনিসিস’ (২০১৫)-এ সারা কনর, ‘মি বিফোর ইউ’ (২০১৬)-এ লুইজা ক্লার্ক, ‘সোলো: আ স্টার ওয়ারস স্টোরি’ (২০১৮)-এ কিরা এবং রোমান্টিক কমেডি ‘লাস্ট ক্রিসমাস’ (২০১৯)-এ নজর কাড়েন তিনি। ব্রডওয়েতে ২০১৩ সালে ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিজ’ এবং লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ডের মঞ্চেও তিনি কাজ করেন। ২০১৮ সালে বাফটা লস অ্যাঞ্জেলেসের ব্রিটানিয়া পুরস্কার এবং ২০১৯ সালে টাইম সাময়িকীর বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান পান এমিলিয়া।
তবে ক্যারিয়ারের প্রথম বড় সাফল্যের মুখ দেখার সময়েই ২০১১ সালে জিমে ব্যায়ামের সময় তীব্র মাথাব্যথা অনুভব করেন এমিলিয়া। হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা যায়, তাঁর মস্তিষ্কে অ্যানিউরিজম ফেটে গেছে। জরুরি অস্ত্রোপচারের পর স্মৃতিশক্তি ও বাকশক্তি হারানোর ভয় তাড়া করলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আবার শুটিংয়ে ফেরেন তিনি। এর তিন বছর পর ২০১৪ সালে দ্বিতীয়বার ব্রেন হেমারেজের শিকার হলে আরও জটিল অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁকে। মানসিক ভীতি, লজ্জা ও দুর্বল ভাবার ভয়ে তিনি দীর্ঘদিন এ তথ্য গোপন রেখেছিলেন। চিকিৎসকেরা তিনি বেঁচে থাকবেন নিশ্চিত করার পরই কেবল এইচবিও কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়। লন্ডনে ‘পাওয়ার অব উইমেন’ অনুষ্ঠানে এমিলিয়া সম্প্রতি জানান, দীর্ঘদিন তাঁর মনে হতো তিনি মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে বেঁচে আছেন। দুশ্চিন্তা, ক্লান্তি ও শারীরিক সমস্যাকে কাজের চাপ মনে করে চেপে রাখলেও পরে তিনি চিকিৎসকদের মাধ্যমে মানসিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হন।
নিজের এই কঠিন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ২০১৯ সালে অসুস্থতার কথা প্রকাশ্যে আনেন এমিলিয়া। রোগীদের পুনর্বাসন ও মানসিক সেবা দিতে মা জেনি ক্লার্ককে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘সেম ইউ’ নামের একটি দাতব্য সংস্থা। এমিলিয়ার মতে, হাসপাতালে জীবন বাঁচানো হলেও হাসপাতাল থেকে ফিরে সুস্থ হয়ে ওঠার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থায় ঘাটতি থেকে যায়। বাইরে থেকে রোগী স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরের মানসিক ক্লান্তি ও আত্মসংকটের সমাধান করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে এমিলিয়ার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও বেড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্যারেড সাময়িকীর প্রতিবেদনে সেলিব্রিটি নেট ওর্থ-এর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, এমিলিয়ার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪০ কোটি টাকা। ‘গেম অব থ্রোনস’ ছাড়াও ডিওর, ডলচে অ্যান্ড গাব্বানা এবং ক্লিনিকের মতো শীর্ষ ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন থেকে তাঁর এই আয় এসেছে। কাজের দিক থেকে ২০২৩ সালে মার্ভেলের সিরিজ ‘সিক্রেট ইনভেশন’-এ ‘গিয়াহ’ চরিত্রে অভিনয় করার পর ২০২৬ সালে পিকক প্ল্যাটফর্মের থ্রিলার সিরিজ ‘পনিস’-এ কেন্দ্রীয় চরিত্রে কাজ করছেন তিনি। সত্তরের দশকের মস্কোয় মার্কিন দূতাবাসে কর্মরত দুই নারীর স্বামীদের রহস্যজনক মৃত্যুর পর গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়ার গল্প নিয়ে তৈরি এই সিরিজে তাঁর সহশিল্পী হ্যালি লু রিচার্ডসন।





