দেশে নার্সিং প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আশানুরূপ হারে বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের কারিকুলাম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে তৈরি করা হয়নি। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে না পারায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নার্সদের পেশাগত জীবনে। তাদের বিরুদ্ধে অপেশাদার আচরণ ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠছে, যার ফলে বিদেশে শ্রমবাজারেও তারা আশানুরূপ সুযোগ তৈরি করতে পারছেন না।
দেশের প্রধান চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও হাসপাতালে জনবল সংকটের চিত্র ভয়াবহ। এখানে প্রায় ৩২০০ চিকিৎসকের বিপরীতে নার্স রয়েছেন মাত্র ২৬০০ জন। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স থাকার কথা। সেই হিসাবে হাসপাতালটিতে প্রায় ৯৬০০ নার্স প্রয়োজন। অর্থাৎ, এখানে নার্সের ঘাটতি প্রায় ৭৩ শতাংশ। শুধু ঢামেক নয়, দেশের সরকারি ও বেসরকারি অধিকাংশ হাসপাতালেই প্রয়োজনের তুলনায় নার্স কম থাকায় কর্মরতদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ বাড়ছে। এর সাথে কর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত পরিবেশের অভাব, পদোন্নতির সীমিত সুযোগ, দক্ষ জনবলের ঘাটতি ও উপযুক্ত সম্মানী না পাওয়ার মতো জটিলতাগুলো তাদের পেশাগত জীবনকে কঠিন করে তুলছে।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে নার্সদের সেবা নিয়ে রোগীদের স্বজনদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ বিদ্যমান। প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায় যে, একাধিকবার ডাকার পরও নার্সরা সাড়া দেন না। এছাড়া অপেশাদার আচরণ ও অদক্ষতার কারণে ভুল সেবায় অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মতো গুরুতর ঘটনাও ঘটছে। একদিকে জনবল সংকটে নার্সদের ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে সেবার মান নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা প্রশ্ন।
বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের তথ্যমতে, দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা এক লাখ ৩৬ হাজার ৭৯৩ জন, যার বিপরীতে ধাত্রীসহ নার্স রয়েছেন এক লাখ ৫৩ হাজার ৬১৩ জন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এই সংখ্যা চার লাখ ১০ হাজার ৩৭৯ জন হওয়ার কথা। অর্থাৎ, দেশে বর্তমানে দুই লাখ ৫৬ হাজার ৭৬৬ জন নার্সের ঘাটতি রয়েছে, যা মোট প্রয়োজনের ৬২.৬ শতাংশ। বর্তমানে একজন চিকিৎসকের বিপরীতে নার্স রয়েছেন মাত্র ১.১২ জন। সরকারি চাকরিতে কর্মরত আছেন ৪৪ হাজার ৮৫৮ জন নার্স, আর বাকিদের কেউ বেসরকারি খাতে যুক্ত আছেন অথবা বেকার।
জনসংখ্যার অনুপাতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে ২৩ জন নার্স থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশে রয়েছেন মাত্র ছয়জনের মতো। যেখানে নেপালে প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে নার্সের সংখ্যা প্রায় ৪২ এবং মালদ্বীপে ৫০ জন। দক্ষিণ এশিয়ায় নার্সের সংখ্যায় বাংলাদেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পরেই অবস্থান করছে। এছাড়া সোসাইটি ফর নার্সেস সেফটি অ্যান্ড রাইটসের (এসএনএসআর) জরিপ অনুযায়ী, কর্মরত ৯২ শতাংশ নার্স কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এবং ৯৬ শতাংশ নার্স কাজের তুলনায় কম বেতন পাচ্ছেন।
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০: ৩৮আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০: ৪৬





