নওগাঁর রানীনগরে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের নাটক সাজানোর অভিযোগে তিন কর্মকর্তাসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অনলাইন জুয়ায় হেরে গ্রাহকদের টাকা আত্মসাৎ করতে এবং সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই এই ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। গত ৬ থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত নওগাঁ, জয়পুরহাট ও দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
শুক্রবার দুপুরে নওগাঁর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম এই তথ্য জানান। এ সময় গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে ছিনতাইয়ের ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা, একটি মোটরসাইকেল এবং ৭টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—নওগাঁর রানীনগর উপজেলার বিশিয়া গ্রামের আব্দুল জব্বারের ছেলে স্বপন (২৮), একই গ্রামের ওয়াজেদের ছেলে হাসান আলী (২৫), ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের দুই কর্মকর্তা অলংকার দিঘি গ্রামের ইদ্রিস আলীর ছেলে সুজন আলী (২৭) ও সিমলাদার গ্রামের আব্দুল ওহাবের ছেলে আবু তালেব (২২), এজেন্ট ব্যাংকের অফিস সহায়ক অলংকার দিঘি গ্রামের আব্দুল মজিদের ছেলে রাসেল বাবু (২২) এবং মোটরসাইকেলের মালিক রাব্বি আলী।
পুলিশ সুপার জানান, গত ৬ অক্টোবর দুপুরে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ক্যাশিয়ার নাজমুল এবং অফিস সহায়ক রাসেল বাবু আদিমদিঘী রেলগেট থেকে ৩৪ লাখ টাকা নিয়ে মোটরসাইকেলে করে আবাদপুকুর বাজার শাখার উদ্দেশ্যে রওনা হন। বেলা ১টার দিকে রানীনগরের পারইল বাজার পার হয়ে বাংলালিংক টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে একটি মোটরসাইকেল তাদের পথ রোধ করে। এরপর লোহার স্টিক দিয়ে মারধর করে তাদের কাছে থাকা ৩৪ লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
ঘটনার পর পুলিশ তদন্তে নামে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ওই রাতেই রানীনগর থানা ও জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ অভিযান চালিয়ে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরসাইকেলসহ এর মালিক রাব্বি আলীকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে ৭ অক্টোবর রাতে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থেকে স্বপন ও হাসান আলীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৮ অক্টোবর রানীনগর থেকে এজেন্ট ব্যাংকের ওই তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, অফিস সহায়ক রাসেল, কর্মকর্তা সুজন ও আবু তালেব গত কয়েক মাস ধরে অনলাইন জুয়া খেলে প্রায় ৭-৮ লাখ টাকা হেরে যান। এরপর তারা গ্রাহকদের টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে জুয়া খেলায় খাটাতে থাকেন এবং সেখানেও লোকসান করেন। এই ঘাটতি পূরণ করতে তারা স্বপন ও হাসানসহ কয়েকজনের সঙ্গে মিলে এজেন্ট ব্যাংকের মালিক মো. ফিরোজ হোসেনের টাকা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন। দীর্ঘ এক মাস ধরে এই পরিকল্পনা করা হয়।
ঘটনার দিন রাসেল বাবু ক্যাশিয়ার নাজমুলকে সঙ্গে নিয়ে টাকা আনতে যান এবং পথিমধ্যে স্বপন ও হাসানসহ পলাতক আসামিদের তাদের অবস্থান জানাতে থাকেন। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছালে স্বপন ও হাসান তাদের পথ রোধ করে মারধর করে টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ক্যাশিয়ার নাজমুল ছিলেন প্রকৃত ভিকটিম, যাকে লোহার পাইপ দিয়ে মারধর করা হয়েছিল। আর রাসেল বাবু ছিলেন এই সাজানো নাটকের অন্যতম পরিকল্পনাকারী।
ছিনতাই করা ৩৪ লাখ টাকার মধ্যে এজেন্ট ব্যাংকের তিন কর্মকর্তার ১০ লাখ টাকা এবং বাকি টাকা অন্য ছিনতাইকারীদের নেওয়ার চুক্তি ছিল। স্বপন ও হাসানকে প্রাথমিকভাবে দেড় লাখ টাকা দিয়ে নওগাঁ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হবে। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) জিন্নাহ আল মামুন, ডিবি পরিদর্শক হাসিবুল্লাহ হাসিব, নওগাঁ সদর থানার ওসি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান এবং রানীনগর থানার ওসি জাকারিয়া মন্ডল উপস্থিত ছিলেন।





