বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পাস করা প্রকৌশলীদের প্রায় ৬০ শতাংশই বর্তমানে ভাগ্য অন্বেষণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাচ্ছেন। এছাড়া একটি অংশ ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়াকেও বেছে নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে সামান্য কিছু শিক্ষার্থীর লক্ষ্য থাকে সরাসরি বিদেশে যাওয়া, তবে সিংহভাগই মূলত দেশের শ্রমবাজারের অদ্ভুত বৈষম্য এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়নের অভাবে বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়ছেন। কর্মক্ষেত্রে পেশাগত বিকাশের সুযোগ না থাকা এবং প্রকৌশলবিদ্যার চেয়ে কেরানিগিরির চর্চা বেশি হওয়ার কারণে অনেক মেধাবী প্রকৌশলীই দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন বলে মনে করছেন বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী বিদেশে অবস্থানরত দক্ষ জনশক্তিকে দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে যারা নাসা, বোয়িং, এনভিডিয়া বা ফোর্ড মোটর কোম্পানির মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন, তারা দেশে ফিরে উপযুক্ত সুযোগ না পেলে কীভাবে চলবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষামন্ত্রী নিজেও একসময় রসায়নবিজ্ঞানী হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে দেশে ফিরে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু সবার পক্ষে এমন ঝুঁকি নেওয়া বা সুযোগ পাওয়া সম্ভব নয়। ঢালাওভাবে সবাইকে ফিরে আসার আহ্বান না জানিয়ে কোন খাতে দক্ষ জনবল প্রয়োজন তা পরিকল্পিতভাবে নির্ধারণ করা উচিত এবং দেশে যারা আছেন তাদের উপযুক্ত সম্মান দেওয়া প্রয়োজন।
১৮ কোটি মানুষের দেশ থেকে অত্যন্ত স্বচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে বুয়েটে প্রতি বছর শীর্ষ হাজার-বারোশ শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। বিশ্বের আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এত বিপুল পরিমাণ মেধার সমাবেশ একসঙ্গে ঘটে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অথচ এই শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা বা ভালো ক্লাসরুম দেওয়া সম্ভব হয় না। এমনকি বাজেট সংকটের কারণে মাঝেমধ্যে বোর্ড মার্কার, কাগজ সরবরাহ কিংবা গবেষণার অর্থও সংকুচিত হয়ে পড়ে। তা সত্ত্বেও বুয়েটের ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিদেশে গিয়ে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছেন এবং উচ্চ কদর পাচ্ছেন।
দেশে বুয়েট গ্র্যাজুয়েটদের মেধা কাজে লাগানোর সুযোগ খুবই সীমিত। চাকরিতে পদোন্নতির সমস্যা এবং ডিপ্লোমা ও স্নাতক প্রকৌশলীদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণে অনেকেই এখন প্রকৌশল সংস্থার চাকরির চেয়ে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারকে বেছে নিচ্ছেন। বুয়েট পাস করে প্রশাসন ক্যাডারে যাওয়া নিয়ে করের টাকার অপচয়ের যে সমালোচনা হয়, তার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইতিহাস, ভূগোল বা অর্থনীতি পড়ে প্রশাসন ক্যাডারে গেলে যেখানে কোনো প্রশ্ন তোলা হয় না, সেখানে প্রকৌশলী বা চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন তোলাকে অনেকেই পেশাগত ঈর্ষা হিসেবে দেখছেন। শিক্ষামন্ত্রী নিজেও বুয়েটে গিয়ে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অথচ বুয়েটের শীর্ষ মেধাবীরা সাধারণত প্রশাসনে যান না এবং যারা যান তাদের সংখ্যাও অত্যন্ত নগণ্য। প্রকৌশলীদের পেশাকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হলে তারা নিজেদের পেশাতেই থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন।
এছাড়া বুয়েটের অনেক স্নাতক পরবর্তী সময়ে ব্যবসায় প্রশাসনে উচ্চতর ডিগ্রি (এমবিএ) নিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় সফলতার সাথে কাজ করছেন। বিদেশেও প্রকৌশলীদের আইন বা চিকিৎসা শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা নিয়ে ভিন্ন পেশায় সফল হওয়ার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। ১৯৯৬ সালে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এক মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের উদাহরণ টেনে বুয়েটের এই অধ্যাপক বলেন, প্রকৌশল ব্যাকগ্রাউন্ডের কেউ কর্পোরেট আইনজীবী বা মেডিকেল রিসার্চে কাজ করলে তা শিক্ষার অপচয় নয়, বরং অর্জিত জ্ঞান কোনো না কোনোভাবে পেশাগত কাজেই ব্যবহৃত হয়।





