চট্টগ্রাম নগরের তালিকাভুক্ত ‘সন্ত্রাসী’ ও কিশোর গ্যাং নেতা ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে নগর ভবনে বাধার মুখে পড়েছিল পুলিশ। ওই ঘটনার পরদিনই খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিমকে থানা থেকে সরিয়ে নগর বিশেষ শাখায় (সিটি এসবি) বদলি করা হয়েছে। মাত্র এক মাস ১০ দিন আগে এই থানায় যোগ দেওয়া ওসিকে এভাবে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তবে নগর পুলিশ কমিশনার এটিকে রুটিন বদলি হিসেবে দাবি করেছেন।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে ওয়াকিল টাইগারপাসে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ে অবস্থান করছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে খুলশী থানা পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। পুলিশ ভবনে ঢোকার চেষ্টা করলে চসিক মেয়র শাহাদাত হোসেন ও অভিযানে যাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে তুমুল বাগ্বিতণ্ডা হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা পুলিশ সেখানে অবস্থান করলেও শেষ পর্যন্ত ওয়াকিলকে পাওয়া যায়নি। ওয়াকিল মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এবং মেয়রের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তিন মাস আগে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
এই অভিযানের পরদিন বুধবার নগরের ঈদগাঁহ রূপসা বেকারি এলাকায় এক পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মেয়র শাহাদাত হোসেন। তিনি খুলশী থানার ওসির অপসারণ দাবি করে অভিযোগ করেন, ওসি আবদুর রহিম পরিকল্পিতভাবে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। মেয়রের দাবি, ওয়াকিল কোনো সন্ত্রাসী নন, বরং তিনি একজন ‘জুলাই যোদ্ধা’। বিগত সরকারের আমলে তাঁর বিরুদ্ধে ১৭০ থেকে ১৮০টি রাজনৈতিক মামলা দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি গত ১৭-১৮ বছর ধরে বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। মেয়র আরও অভিযোগ করেন, ওসি আবদুর রহিম আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাকলিয়া থানার ওসি থাকাকালে বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং খুলশী থানায় যোগ দেওয়ার পরও তিনি আওয়ামী লীগের কোনো প্রভাবশালী নেতাকে গ্রেপ্তার না করে ছাত্রদল ও যুবদলের কর্মীদের টার্গেট করছেন।
মেয়রের গাড়িতে করে ওয়াকিল নগর ভবন থেকে পালিয়েছেন—এমন গুঞ্জন নাকচ করে মেয়র বলেন, ওয়াকিল তাঁর গাড়িতে উঠেছেন এমন প্রমাণ কেউ দিতে পারলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন। সামনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাঁর ভালো ভাবমূর্তি নষ্ট করতে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। এছাড়া গত ২৯ সেপ্টেম্বর খুলশীর ওয়্যারলেস কলোনিতে ১৬ বছর বয়সী কিশোর মোহাম্মদ হৃদয় হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওসির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মেয়র। তাঁর দাবি, মামলার আসামি কামরুলকে মারধর করে পুলিশ জোরপূর্বক ওয়াকিল ও তাঁর ভাইয়ের নাম বলিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বদলি হওয়া ওসি আবদুর রহিম জানান, তিনি ছুটিতে থাকায় নগর ভবনের অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত জানতেন না। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর পাহাড়তলী কলেজের এক সাময়িক শিক্ষক মিজানুর রহমানকে মারধরের মামলায় ওয়াকিলকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করেছিলেন। গত ৪ সেপ্টেম্বর সকালে ওয়াকিলকে গ্রেপ্তার করতে গেলে তাঁর লোকজন পুলিশের ওপর হামলা চালায় ও গাড়ি ভাঙচুর করে। এতে ওসিসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন। ওই ঘটনায় ওয়াকিলকে প্রধান আসামি করে মামলা করা হয়েছিল। পরে ওসির বিরুদ্ধেও আদালতে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে মামলা করেন ওয়াকিলের বাবা, যা বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াকিলের বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৩টি মামলা রয়েছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ওয়্যারলেস কলোনিতে কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপ ‘সেভেন স্টার’ ও ‘ফাইভ স্টার’-এর বিরোধে হৃদয় নামের এক কিশোর নিহত হয়। স্থানীয়দের মতে, ওয়াকিলের গ্রুপ সেভেন স্টার এবং খুলশী থানা যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল হোসেনের গ্রুপ ফাইভ স্টারের দ্বন্দ্বের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে, যেখানে ওয়াকিলকেও আসামি করা হয়েছে। এছাড়া গত মঙ্গলবার জমি দখল, চাঁদাবাজি ও অপহরণের অভিযোগে ওয়াকিলসহ ৩৭ জনের বিরুদ্ধে খুলশী থানায় আরেকটি মামলা করেন ‘চট্টগ্রাম খবর’-এর সম্পাদক শেখ মুহাম্মদ আরিফ।
নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানান, ওসির বদলি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া এবং কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান জিরো টলারেন্স। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, রাজনৈতিক নেতার অভিযোগে এভাবে দ্রুত ওসি বদলি করা হলে মাঠপর্যায়ে পুলিশ কীভাবে কাজ করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এদিকে ওয়াকিলের ভাই রকি হোসেন পিচ্চি এই অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন। তবে মামলার বাদী শেখ মুহাম্মদ আরিফ প্রশ্ন তুলেছেন, একজন কিশোর গ্যাং নেতার প্রতি মেয়রের এত সহানুভূতি কেন, যা পুরো এলাকার মানুষকে আতঙ্কে রেখেছে।
এ ঘটনায় ওয়াকিলকে প্রধান আসামি করে ১৪ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করে মামলা করে পুলিশ।তবে পুলিশের ওই অভিযানের ঘটনায় পরে ওসি আবদুর রহিমের বিরুদ্ধেও আদালতে মামলা করেন ওয়াকিলের বাবা।
এতে অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।





