তেল ও কয়লার চেয়ে সাশ্রয়ী সৌরবিদ্যুৎ, জোর দিচ্ছে সরকার

Published: October 8, 2026, 7:53 am

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহসংকটের কারণে যখন দেশের জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, তখন পদ্মার চরে গড়ে ওঠা সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র মানুষকে স্বস্তি দিচ্ছে। ২০২৪ সালে পাবনার ভবানীপুরে পদ্মার ধু ধু বালুচরের ৪০০ একর জমির ওপর প্যারামাউন্ট গ্রুপের নির্মিত ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি দিনের বেলা জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। এই সৌরবিদ্যুতের জন্য কোনো বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে না এবং এটি পরিবেশবান্ধব। ২০২১ সালে করা ২০ বছরের চুক্তি অনুযায়ী এই কেন্দ্রের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়ছে সাড়ে ১১ সেন্ট বা প্রায় ১৩ টাকা। এর বিপরীতে ফার্নেস তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিটের ব্যয় ২৮ টাকার বেশি এবং কয়লাবিদ্যুতে এই খরচ প্রায় ১৫ টাকা, যার সঙ্গে পরিবেশদূষণের ঝুঁকিও জড়িত।

আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত অবহেলিত ছিল। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে মোট ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি হলেও তার অধিকাংশ ছিল জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৩৪৭ মেগাওয়াট, যার মধ্যে সৌর, পানি ও বায়ুসহ নবায়নযোগ্য খাতের ১৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে মাত্র ১ হাজার ৮৯ মেগাওয়াট বা গ্রিডের মাত্র ৪ শতাংশ। অন্যদিকে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) হিসাব মতে, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎসহ গ্রিডে যুক্ত আছে ১ হাজার ৪৯২ মেগাওয়াট, যা মোট সক্ষমতার ৫ শতাংশ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ২০২১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে করার লক্ষ্য থাকলেও তা অর্জিত হয়নি, এমনকি ২০২৫ সালের লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ সম্ভব হয়নি। ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ হওয়া ৩ হাজার কোটি ডলারের (প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা) মধ্যে মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছিল।

নতুন বিএনপি সরকার এখন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আগামী গ্রীষ্মের ভোগান্তি এড়াতে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে ছাদবিদ্যুতে জোর দেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রতি ইউনিট ছাদবিদ্যুৎ সরকার সাড়ে ১০ টাকায় কিনে নেবে। ছাদের পাশাপাশি সরকারি জমিতে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ইতিমধ্যে বাগেরহাটের রামপালে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমিতে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন করেছে সরকার। এছাড়া সৌরবিদ্যুৎ তৈরির উপকরণ আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে।

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, যার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতে থাকে এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ে। তখন বিদ্যুৎকেন্দ্র অনেক থাকলেও মানুষকে লোডশেডিংয়ে ভুগতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিতে বাধ্য হয় তৎকালীন সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে দরপত্র ছাড়াই বিশেষ বিধান আইনে ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সম্মতিপত্র দেওয়া হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর আদালত বিশেষ ক্ষমতা আইন রহিত করার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ওই সম্মতিপত্রগুলো বাতিল করা হয়। ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর ৩১টি কোম্পানিকে পিডিবি জানায় যে তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনা হবে না। এর বিরুদ্ধে ১৫টি কোম্পানি উচ্চ আদালতে ১১টি রিট দায়ের করে।

তবে দরপত্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সাশ্রয় দেখা গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দরপত্র ডেকে প্রতি ইউনিট ৮ টাকার কম দরে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি করা গেছে। ১০টি দরপত্রে সৌরবিদ্যুতের গড় দাম পড়েছে ৮ দশমিক ২৭ সেন্ট (১০ টাকার কিছু বেশি), যা বাতিল হওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর গড় দাম ১০ দশমিক carts (প্রায় ১৩ টাকা) এর চেয়ে ২১ শতাংশ কম। এমনকি একটি চুক্তি হয়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৪৯ সেন্টে (৯ টাকার কিছু বেশি)। এরই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কয়েক দফায় দরপত্র ডেকে গত ২৫ জানুয়ারি ৭টি এবং ২৯ জানুয়ারি ৪টি মিলিয়ে মোট ১১টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি সম্পন্ন করা হয়, যেগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ৮১৮ মেগাওয়াট। নতুন বিএনপি সরকার আসার পর এখন পর্যন্ত ১০টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, তবে দরপত্র জমার সময় একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে।

বর্তমানে বেসরকারি খাতে ১ হাজার ৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৯টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ চলমান আছে। সরকারি খাতে নির্মাণাধীন ৬টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা রয়েছে, যার মধ্যে ১০০ মেগাওয়াটের একটির চুক্তি হয়েছিল ২০২৩ সালে এবং বাকি ৫টি কেন্দ্র থেকে ১০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের চুক্তি হয় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। এছাড়া কক্সবাজারে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মতিপত্র দেওয়া হয়েছে, যার চুক্তি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন। তবে সার্বভৌম গ্যারান্টি বাতিল করা, জমি কেনায় জটিলতা, নতুন উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতার অভাব এবং মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে সরঞ্জাম আমদানি ব্যাহত হওয়ায় নতুন চুক্তি হওয়া সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে আগামী দু-এক বছরে বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তিনটি প্রকল্পের কাজ পাওয়া কনফিডেন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ইমরান করিম জানান, জমি ও ব্যাংকের অর্থায়ন সমস্যার কারণে তাদের উৎপাদন শুরু করতে ২০২৮ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গত এপ্রিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ৩১টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়িত হলে ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো এবং ৬০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ আসত। এর মধ্যে ১৫টি কোম্পানি জমিও কিনে ফেলেছিল। বাতিল হওয়া কেন্দ্রগুলোর মধ্যে চীনের শীর্ষ কোম্পানির ১৫০ মেগাওয়াটের দুটি প্রকল্প এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকা ৬০০ মেগাওয়াটের প্রকল্প ছিল, যার মধ্যে ২০০ মেগাওয়াট ছিল ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প। বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ না পেয়ে চীনের ওই শীর্ষ কোম্পানিটি বিগত দুই বছরে ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামে বিনিয়োগ করেছে এবং বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় ৭০০ কোটি ডলারের বিশাল বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। বাতিল হওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নতুন করে দরপত্র ডাকলে পাঁচ বছর আগে বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসবে না। বরং বাতিল হওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দ্রুত যাচাই–বাছাই করে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দর-কষাকষি করে মূল্য কমিয়ে বাতিল হওয়া কিছু কেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি করলে দ্রুত বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব, যেমন নীলফামারীর ডিমলায় ৫০ মেগাওয়াট ও দিনাজপুরে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র আগামী বছরের মধ্যেই উৎপাদনে আসতে পারত। এ কেন্দ্র দুটির সবকিছু তৈরি হওয়ার পর বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির খসড়াও তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, যেসব বাতিল হওয়া প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি আছে এবং যারা নিয়ম মেনে বিনিয়োগ করেছে, তাদের উৎপাদনে আনার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের ছাদের সৌরবিদ্যুৎ থেকেও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ গেছে বলে জানিয়েছেন মীর শাহে আলম।

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সৌরবিদ্যুৎ খাতে প্রতিবেশী দেশগুলো ব্যাপক অগ্রগতি দেখিয়েছে। ভারত ২০০৬ সালে আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করে বর্তমানে তাদের ২০৩ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণ করছে। ভিয়েতনামের সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ২০১৮ সালের ৮৬ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ২০২৫ সালের শেষে ১৯ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। পাকিস্তানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডেই যুক্ত হয়েছে ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। বাংলাদেশেও প্রায় ৩৬ লাখ একর খাসজমি ও ১৮ লাখ একর অকৃষিজমি রয়েছে, যার মধ্যে চরের ৩০ হাজার একর জমি ব্যবহার করে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। পিডিবির প্রায় ৬ হাজার একর জমি আছে, এখানেও সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র করা যায়। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বর্তমান সরকার।

নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। ৫০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করতে সাড়ে তিন কোটি ডলার বা ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়, যা ৬ থেকে ৭ বছরের মধ্যে উঠে আসে। তিনি আরও বলেন, ছাদ ও ক্ষুদ্র আকারের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের ইতিবাচক তৎপরতা থাকলেও বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে গতি বাড়াতে হবে। বাতিল হওয়া কেন্দ্রগুলো মূল্যায়নে গঠিত কমিটির দ্রুত প্রতিবেদন দেওয়া উচিত এবং প্রয়োজনে বিদ্যুতের দাম নিয়ে সমঝোতা করে উপযুক্ত বিদেশি কোম্পানিগুলোকে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo