চাহিদা হ্রাস ও কাঁচামালের সংকটে বোচাগঞ্জের হাতপাখা কারিগররা শঙ্কিত

Published: September 18, 2026, 5:34 am

দিনাজপুরের বোচাগঞ্জে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ঐতিহ্যবাহী বাঁশের হাতপাখার চাহিদা দিন দিন কমছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাঁচামাল বাঁশের দুষ্প্রাপ্যতা ও চড়া দাম। ফলে পূর্বপুরুষদের এই পেশা ধরে রাখা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় কারিগররা। পর্যাপ্ত লাভ না থাকায় নতুন প্রজন্মের মধ্যেও এই কাজ শেখার বা ধরে রাখার কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।

বোচাগঞ্জ উপজেলার সেতাবগঞ্জ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মালিপাড়া এলাকায় যুগ যুগ ধরে হাতপাখা তৈরির কাজ চলছে। এখানকার বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী রমেন ও তার স্ত্রী কল্পনা (২৮) বংশানুক্রমিকভাবে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাদের মতো এ এলাকায় আরও পাঁচ-ছয়টি পরিবার এখনো এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে। রমেন জানান, বর্তমানে তাদের পরিবারের চারজন সদস্য এই পাখা তৈরির কাজে নিয়োজিত আছেন। তবে প্রধান কাঁচামাল বাঁশ বাজারে সহজে পাওয়া যায় না এবং দাম বেশি হওয়ায় তাদের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।

একটি হাতপাখা তৈরি করতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। রমেন ও কল্পনা দম্পতি দিনে গড়ে ৮ থেকে ১০টি পাখা তৈরি করতে পারেন। প্রতিটি পাখা তৈরিতে বাঁশসহ অন্যান্য কাঁচামাল বাবদ খরচ হয় ১০ থেকে ১৫ টাকা। পাইকারি বাজারে এগুলো প্রতিটি ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি করা হয়। খরচ বাদে একটি পাখা থেকে তাদের ১৫ থেকে ২৫ টাকা লাভ থাকে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকা আয় হয়, যা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সংসারের কাজের পাশাপাশি স্বামীকে সহযোগিতা করা কল্পনা জানান, গরমের তীব্রতা বাড়লে এবং বিশেষ করে বিদ্যুৎ চলে গেলে হাতপাখার চাহিদা কিছুটা বৃদ্ধি পায়। তবে বৈদ্যুতিক ফ্যান, চার্জার ফ্যান ও বাজারে আসা সস্তা প্লাস্টিকের পাখার কারণে এখন আর আগের মতো সারা বছর হাতপাখার কদর থাকে না। মূলত অগ্রহায়ণ থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত হাতপাখা তৈরি ও বিক্রির মূল মৌসুম হলেও বাজার দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে।

কারিগর রমেন বলেন, আগে হাতপাখার ব্যাপক চাহিদা থাকলেও এখন তা অনেক কমে গেছে। বাঁশ কাটার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জাম এবং আর্থিক সহায়তা পেলে তারা এই ঐতিহ্যবাহী পেশাটি টিকিয়ে রাখতে পারতেন। সরকারি কোনো সাহায্য এখন পর্যন্ত তারা পাননি বলে জানান।

এই হস্তশিল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোর সংকটের কথা স্বীকার করে বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ হাসান জানান, কারিগরদের সমস্যাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সম্ভাব্য সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, আধুনিক সভ্যতায় নানা ধরনের ফ্যানের ব্যবহার বাড়লেও লোডশেডিংয়ের সময় এখনো হাতপাখার প্রয়োজন অনুভূত হয়। গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ এই শিল্পটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে কারিগরদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অত্যন্ত জরুরি।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh