একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বিভিন্ন প্রকার জীবের একত্র সমাবেশই মূলত জীববৈচিত্র্য। অন্যভাবে বলতে গেলে, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রজাতির মধ্যে জীনগত, প্রজাতিগত ও বাস্তুতান্ত্রিক যে তারতম্য বা বৈচিত্র্য দেখা যায়, তাকেই জীববৈচিত্র্য বলা হয়। এ প্রসঙ্গে জীববিজ্ঞানী ম্যাকেঞ্জির মতে, বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন স্তরের জীবদের ক্ষেত্রে একই প্রজাতির জীবের জীনগত প্রকরণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির বৈচিত্র্যসমূহকে জীববৈচিত্র্য বলে। জীবের এই বৈচিত্র্যময়তা মহান আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি ও তাঁর নির্ধারিত নেয়ামত। পবিত্র কোরআনের সুরা শুরার ২৯ নম্বর আয়াতে এরশাদ হয়েছে, 'তাঁর নিদর্শনাবলির একটি হলো, আসমান ও জমিন এবং এর মাঝে বিস্তৃত জীবজন্তুর সৃষ্টি। নিশ্চয়ই তিনি চাইলেই সবকিছু একত্রিত করতে সক্ষম।'
পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে প্রাণিজ ও উদ্ভিদজাত সব উপাদানকে কোরআন ও সুন্নাহ নির্দেশিত উপায়ে ব্যবহার করা জরুরি। পরিবেশ ও প্রকৃতিকে মানুষের তৈরি কৃত্রিম নিয়ম ও অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারলে জীববৈচিত্র্যের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। গ্রীন হাউজ এফেক্ট বা পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে প্রকৃতিকে তার আসল রূপ ও নিজস্ব অবস্থায় অক্ষত রাখা প্রয়োজন। মানুষ যদি নিজেরাই জীববৈচিত্র্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে সঠিক নিয়মে ব্যবহার না করে, তবে পরিবেশ মানুষের ওপর বিরূপ আচরণ শুরু করবে। ফলে পৃথিবী তার নিজস্ব রূপ, গতিময়তা ও কাঠামো হারিয়ে ফেলবে। এ বিষয়ে সুরা রুমের ৪১ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, 'জলে-স্থলের সব বিপদ মানুষের হাতের কামাই। যাতে তারা তাদের কৃতকর্মের কুফল ভোগ করে এবং তা থেকে ফিরে আসে।'
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রধানত গাছপালা, তরুলতা, জলবায়ু, জীবজন্তু ও পশুপাখির সঠিক সংরক্ষণ এবং উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ (সা.) পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় যে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তা সর্বকালে সমানভাবে প্রযোজ্য ও টেকসই। বিশেষ করে বনাঞ্চল ও বৃক্ষভূমি বাড়াতে তিনি ব্যাপক উৎসাহ দিয়েছেন এবং গাছপালা রোপণের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। এ বিষয়ে রাসুল (সা.) বলেন, 'যদি কারও হাতে রোপণ করার কোনো চারা থাকে, এমতাবস্থায় কেয়ামত এসেও যায় এবং রোপণ করার সময় পাওয়া যায়, তাহলে তা রোপণ করা ছাড়া সে যেন দাঁড়িয়ে না থাকে।' (উমদাতুল কারি : ১২/১৫৪)। অন্য একটি হাদিসে তিনি বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়া বা ধারাবাহিক পুণ্য হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, 'যে ব্যক্তি অন্যায়-জুলুম না করে কিছু নির্মাণ করল অথবা কোনো চারা রোপণ করল, যতদিন পর্যন্ত আল্লাহর সৃষ্টি তা থেকে উপকৃত হবে, ততদিন রোপণকারী সওয়াব পেতে থাকবে।' (উমদাতুল কারি : ১২/১৫৫)।
উদ্ভিদের মাধ্যমেই পরিবেশ, প্রাণী ও আবহাওয়া সপ্রাণ থাকে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, একটি দেশের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে মোট ভূখণ্ডের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা আবশ্যক। পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হলো পর্যাপ্ত বনভূমি না থাকা। রাসুল (সা.) যেমন বনভূমি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন, তেমনি অনর্থক গাছপালা কাটা ও বন উজাড় করার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'যুদ্ধক্ষেত্রেও তোমরা কোনো খেজুরগাছ বা অন্যান্য উদ্ভিদ কেটে ফেলো না।' (এরশাদুল ফকিহ : ২/৩২০)।
জলবায়ু পরিবর্তন, আবহাওয়ার বৈরিতা ও জলদূষণ রোধে রাসুল (সা.)-এর নির্দেশনা মেনে চললে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ হয়। পানির অপচয় রোধ এবং পানিতে সব ধরনের ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলা বন্ধ করলে আবহাওয়াজনিত দূষণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। রাসুল (সা.) পানির অপচয় রোধে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। একবার সাহাবি সাদ (রা.) অজুতে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করছিলেন। তখন রাসুল (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'সাদ! পানির অপচয় করছ কেনো?' সাদ (রা.) পাল্টা প্রশ্ন করলেন, 'অজু করার ক্ষেত্রেও কী অপচয় হয়?' রাসুল (সা.) উত্তর দিলেন, 'অবশ্যই। এমনকি তুমি যদি বহমান নদী বা সাগরে বসেও অজু করো, তাহলেও অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা অপচয় হিসেবে গণ্য হবে।' (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪১৯)।
যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করা জলবায়ু ও পরিবেশ দূষণের অন্যতম বড় কারণ। এ জন্য রাসুল (সা.) ছায়াদার গাছের নিচে, মানুষের চলাচলের রাস্তায় এবং স্থির পানিতে মলমূত্র ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, 'তোমরা দুই অভিশপ্ত লোক থেকে বেঁচে থাকো।' সাহাবিরা জানতে চাইলেন, 'তারা কে কে?' রাসুল (সা.) বললেন, 'যে ব্যক্তি লোকদের হাঁটাচলার রাস্তায় মলমূত্র ত্যাগ করে এবং যে মানুষের ছায়া গ্রহণস্থলে পায়খানা-প্রস্রাব করে।' (মুসলিম : ১/১৮৮)। অন্য একটি হাদিসে তিনি আরও বলেন, 'তোমাদের কেউ যেন স্থির পানিতে প্রস্রাব না করে।' (মুসলিম : ১/৭৩)।
ঘরবাড়ি, আঙিনা, রাস্তাঘাট ও শহর-বন্দর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলে পরিবেশ বিপর্যয় থেকে মুক্ত থাকে। পরিচ্ছন্নতার অভাবেই বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশ ও শহর ধীরে ধীরে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে এবং মানুষের জীবন বিপন্ন করছে। এ বিষয়েও রাসুল (সা.) স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, 'তোমরা তোমাদের আঙিনা পরিষ্কার রাখো, ইহুদিরা তাদের বসবাসস্থলের চারপাশ অপরিচ্ছন্ন রাখে।' (তাবারানি : ২/১১)।
পশুপাখি ও জীবজন্তুর মাধ্যমেও পরিবেশের বড় ধরনের বিপর্যয় রোধ হয়। আল্লাহতায়ালা আমাদের চেনা-অচেনা অসংখ্য জীবজন্তু সৃষ্টির মাধ্যমে পৃথিবীর ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। মানুষ যদি অহেতুক প্রাণী হত্যার সংস্কৃতি গড়ে তোলে, তবে তা পরিবেশের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। এ কারণে রাসুল (সা.) কোনো প্রাণীকে অযথা হত্যা করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'কেউ যদি চড়ুই পাখি বা তার চেয়ে ছোট কোনো প্রাণীকেও অকারণে হত্যা করে, কেয়ামতের দিন তাকে জবাবদিহিতা করতে হবে।' (মিরকাত : ২৬৫৮)।





