দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র সরবরাহ সংকটের মধ্যেই গ্রাহক পর্যায়ে এর দাম একলাফে ২৫২ টাকা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এখন থেকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে আনুষ্ঠানিকভাবে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা গুণতে হবে, যা গত মাসে ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। তবে বাজারে গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এই সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, যা নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি। গতকাল রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে নতুন এই দাম কার্যকর হয়েছে।
দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন, যার মধ্যে ৮০ শতাংশ রান্নার কাজে এবং বাকি অংশ শিল্প ও পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। এই চাহিদার ৯৯ শতাংশই আমদানি করে বেসরকারি খাত। এলপিজি আমদানিকারক ও সরবরাহকারীদের সংগঠন লোয়াবের (এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন এবং সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। অর্থাৎ আমদানি স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও বাজারে কৃত্রিমভাবে সরবরাহ কমানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সূত্রমতে, গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমাতে শুরু করে। শুরুতে ৩০ শতাংশ এবং পরবর্তীতে ৫০ শতাংশের বেশি সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে গত এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন কোম্পানির ডিপোতে ডিলারদের ট্রাকের সারি অপেক্ষা করছে, যা ট্রাক ভাড়াও বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, বিইআরসি দাম বাড়ানোর পর কোম্পানিগুলো থেকে সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছে। তবে বাজার পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গত শনিবার ১২টি আমদানিকারক কোম্পানিকে চিঠি দিয়ে পুরো মাসের দৈনিক আমদানি ও সরবরাহের তথ্য চেয়েছে বিইআরসি। ইতিমধ্যে কয়েকটি কোম্পানি তথ্য জমা দিয়েছে। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, কেউ এলপিজি মজুত করেছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোম্পানির দেওয়া তথ্যগুলো মাঠপর্যায়ে গিয়ে যাচাই করা হবে। মাসের মাঝামাঝি সময়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবকে অযৌক্তিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে কেবল গত এপ্রিলে এমনটি করা হয়েছিল। তবে এখন দ্রুতই সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
লোয়াবের সভাপতি আমিরুল হক জানান, আমদানি কমেনি এবং কেউ যেন বেশি দামে বিক্রি না করে সে বিষয়ে আগেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখন সরবরাহ বাড়বে বলে তিনি আশাবাদী। অন্যদিকে, আমদানিকারকদের একাংশ জানান, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জাহাজ ভাড়া বেড়ে গেছে। বিইআরসি বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ায় আগামী মাসের আমদানি ব্যাহত হবে না। তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের (কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এলপিজির দাম বাড়ানো হয়েছে। কারা এই মজুতদারির সঙ্গে জড়িত তা তদন্ত করে দায়ী কোম্পানিগুলোর লাইসেন্স বাতিল করা উচিত।
নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি এলপিজির দাম এখন ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা। সেই সঙ্গে গাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজির (অটো গ্যাস) দাম প্রতি কেজি ৮৪ টাকা 6২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে বিইআরসি নিয়মিত এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসলেও বাজারে তা কার্যকর না হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। চলতি বছরের মূল্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা, ফেব্রুয়ারিতে ১০৩ টাকা বাড়লেও মার্চে অপরিবর্তিত ছিল। এপ্রিল মাসে যুদ্ধের প্রভাবে দুই দফায় ৫৯৯ টাকা বাড়ে। এরপর জুনে ৫৫ টাকা ও জুলাইয়ে ৩৫৭ টাকা কমানো হয়। আগস্টে আবার ৭০ টাকা বাড়িয়ে সেপ্টেম্বরে ১৩ টাকা কমানো হয়েছিল। এর আগে গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতেও বড় ধরনের সরবরাহ সংকট দেখা গিয়েছিল।





