উল্লাসের বুলডোজার এখন সাধারণ মানুষের জন্য বড় আতঙ্ক

Published: October 3, 2026, 4:17 am

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে এক অস্থির সময়ের সূচনা হয়। সেই উত্তাল দিনগুলোতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যালয় ও পলাতক নেতা-কর্মীদের বাসাবাড়িতে বুলডোজার চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় অনেকের মধ্যে উল্লাস দেখা গিয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তখনই সতর্ক করেছিলেন যে, বিচারবহির্ভূত বা বেআইনি উপায়ে স্থাপনা ভাঙার এই উন্মাদনা সমাজে অরাজকতার বীজ বপন করছে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলবে।

সেই আশঙ্কাই এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষোভ মেটানোর সেই বুলডোজার এখন একশ্রেণির দখলবাজের হাতে সাধারণ মানুষের বাড়িঘর ও প্লট দখলের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বুলডোজার না পাওয়া গেলে ভেকু বা এস্কেভেটরকেও একই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর সর্বশেষ ভয়াবহ নজির দেখা গেছে রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে অবস্থিত প্রায় অর্ধশত বছরের পুরনো সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার’ ভাঙচুরের ঘটনায়। গত সপ্তাহে রাতের আঁধারে ভারী যন্ত্রপাতি ও বুলডোজার ব্যবহার করে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবন পুরোপুরি মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়।

সংস্থার দায়িত্বশীলদের তথ্যমতে, এই বর্বরোচিত হামলায় হাসপাতালটির মূল্যবান আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, টিকাদানের সামগ্রী, জেনারেটর, এসি, ফ্রিজ ও ওষুধপত্র লুটপাট করা হয়েছে। প্রায় দেড় কোটি টাকার এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর হামলাকারীরা সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি’র সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়। রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবাদে দুর্বৃত্তরা শিশুদের টিকাদান কেন্দ্র পর্যন্ত ধ্বংস করতে দ্বিধা করেনি।

মিরপুরের এই ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজ দলের দখলবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশ ইতোমধ্যে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি তার এমপি পদ হারিয়েছেন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেবল কুলি বা দিনমজুর পর্যায়ের ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার না করে প্রকৃত ইন্ধনদাতাদের আইনের আওতায় না আনলে এই সংস্কৃতি থামবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতরে প্রতিশোধপরায়ণতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম না মেনে ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নেওয়া রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর। মানবাধিকার সংগঠন ও আইন গবেষকদের মতে, এই ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’ আইনের শাসনকে দুর্বল করে এবং সমাজে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি প্রতিষ্ঠিত করে। তারা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের বেআইনি হামলা ও দখলদারির সংস্কৃতি চলতে থাকলে বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হবেন এবং সার্বিক সামাজিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক খন্দকার আতিকুর রহমান বলেন, যখন আইনি প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে মব জাস্টিসের মাধ্যমে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়াকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, তখন অপরাধী চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তবে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর উদ্যোগ দখলবাজদের এই মানসিকতায় যতি টানতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin