চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের ‘বড় ভাই’ বদল, বাড়ছে অপরাধ ও উৎপাত

Published: October 3, 2026, 3:42 am

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের রাজনৈতিক আশ্রয়দাতারা বদলে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির বিভিন্ন নেতার আশ্রয়ে থাকা কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদার ও সদস্যরা এখন বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতার সঙ্গে ভিড়তে শুরু করেছে। পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রাজনৈতিক ছাতা বদলালেও বন্দরনগরীতে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কমেনি, বরং বেড়েছে।

রাজনৈতিক আশ্রয় পরিবর্তনের একটি বড় উদাহরণ বাকলিয়ার মো. মুরাদ। আওয়ামী লীগ আমলে তিনি নগর যুবলীগের আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর আশ্রয়ে ছিলেন। ১৬টি মামলার এই আসামিকে ৫ আগস্টের পর নগর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক ওরফে বাদশার সঙ্গে মিছিল-সমাবেশে অংশ নিতে দেখা গেছে। নিজের ফেসবুকে মুরাদ নিজেকে চান্দগাঁও থানা যুবদলের সংগঠক হিসেবেও দাবি করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্রবাজি, জায়গা দখল ও মাদক ব্যবসায় কিশোর গ্যাং ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। গত রোববার বাকলিয়ায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাঁর লোকজনের সঙ্গে প্রতিপক্ষের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। তবে নগর যুবদল এক বিবৃতিতে মুরাদকে তাদের দলের কেউ নয় বলে দাবি করেছে এবং এমদাদুল হকও তাঁকে নিজের অনুসারী হিসেবে অস্বীকার করেছেন।

কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় চট্টগ্রামে আরেক আলোচিত নাম ২৩ মামলার আসামি ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা। গত ৮ জুন তাঁকে নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। গত মঙ্গলবার রাতে খুলশীর পাহাড়তলী ওয়্যারলেস কলোনিতে ‘ফাইভ স্টার’ ও ‘সেভেন স্টার’ গ্যাংয়ের বিরোধে খুন হয় ১৬ বছরের কিশোর মো. হৃদয়, যে তার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাবার সঙ্গে ফুটপাতে সবজি বিক্রি করত। পুলিশ ও স্থানীয়দের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ‘সেভেন স্টার’ গ্যাংয়ের সঙ্গে ওয়াকিলের যোগাযোগ রয়েছে। ওয়াকিলের ভয়ে এলাকার মানুষ তটস্থ থাকে। গত ২৯ আগস্ট ওয়াকিলের কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক মিজানুর রহমানকে মারধর ও নির্যাতন করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় শিক্ষক মিজানুর মামলা করলেও ওয়াকিল পলাতক থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে তাঁর ভাই রকি হোসেন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরের অন্তত ৪৫টি এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য রয়েছে। সম্প্রতি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ১১টি গ্যাং—মুরাদপুরের এমবিএস (মোহাম্মদপুর বয়েজ সিন্ডিকেট), পাঁচলাইশের কেবি (খতিবের হাট), এনএস (নাজিরপাড়া), ৯৯৯, এক্স-মার্ক, ব্যাকহোল, ডট গ্যাং, বিঙ্গু, পাইথন, সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টার। গত সাড়ে সাত বছরে নগরে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততায় অন্তত ৬৩৫টি অপরাধের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৩৯টিই হত্যাকাণ্ড। ২০১৮ সালে স্কুলছাত্র আদনান ইসফার হত্যার পর কিশোর গ্যাং নিয়ে আলোচনা শুরু হলে ২০১৯ সালে পুলিশ ৪৮ জন পৃষ্ঠপোষক বা ‘বড় ভাই’-এর তালিকা করে, যা ২০২৪ সালের মার্চে আরও ১৬ জন বেড়ে ৬৪ জনে দাঁড়ায়। এই পৃষ্ঠপোষকদের অধীনে প্রায় ২০০টি গ্যাংয়ে অন্তত ১ হাজার ৪০০ সদস্য সক্রিয় ছিল। বর্তমানে এই সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে ধারণা পুলিশের।

কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে মাদক ব্যবসার সংযোগ দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। নগরের শতাধিক মাদক স্পটে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। মাদক বিক্রির স্থান নিয়ন্ত্রণ, প্রতিপক্ষকে তাড়ানো এবং পুলিশি অভিযানে বাধা দিতেও এদের ব্যবহার করা হচ্ছে। গত আট মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ওপর হামলার অন্তত পাঁচটি ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ জুলাই ডবলমুরিংয়ের আমবাগানে মাদক মামলার আসামিকে ধরতে গিয়ে হামলার শিকার হন এসআই মবিনুল ইসলাম। তাঁকে ছুরিকাঘাত করে ওয়াকিটকিসহ সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি-৭) চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মাদকাসক্ত হওয়ার পর অনেকেই চুরি-ছিনতাইয়ে জড়িয়ে একপর্যায়ে গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, পুলিশের একার পক্ষে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক নেতাদেরও উচিত হবে না এসব গ্যাং সদস্যকে কাছে ভিড়তে দেওয়া। এদিকে নগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান স্বীকার করেছেন যে, আওয়ামী লীগ আমলের কিছু কিশোর গ্যাং সদস্য এখন বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে চলছেন, যা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। তিনি জানান, যারা এদের আশ্রয় দিচ্ছে, তাদের সতর্ক করা হচ্ছে। সুজন চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, শুধু গ্যাং সদস্যদের ধরে লাভ নেই, যারা এদের আশ্রয় দিয়ে স্বার্থ হাসিল করছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে ‘বড় ভাই’ বদলাবে, কিন্তু কিশোর গ্যাংয়ের অবসান হবে না। বর্তমানে চট্টগ্রামে কিশোর অপরাধের ১ হাজার ৬২৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, কিন্তু সাক্ষী হাজির না হওয়ায় বিচার শেষ হচ্ছে না। ২০১৮ সালের আদনান ইসফার হত্যা মামলাটি এখনো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে চলছে, যেখানে ২৬ সাক্ষীর মধ্যে ১৭ জনের সাক্ষ্য নেওয়া সম্ভব হয়েছে এবং সাত আসামিই জামিনে রয়েছেন। এছাড়া গত বছরের সাব্বির হত্যা এবং গত এপ্রিলের সাজিদ হত্যা মামলা এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo