এলপিজি গ্যাসের বাজারে চরম অস্থিরতা, নির্ধারিত দামের চেয়ে বাড়তি দাম

Published: October 1, 2026, 4:16 am

পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাসের নজিরবিহীন সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক শিপিং চার্জ এবং সরকারি নীতিমালার সমন্বয়হীনতায় দেশের বোতলজাত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে তা কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। বরং রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এই সিলিন্ডার ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যে বিক্রি হচ্ছে।

বাজারে এলপিজির সংকট নেই—বিক্রেতাদের এমন দাবির মধ্যেই রাজধানীতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার। শুধু বাড়তি দামই নয়, সেই দাম দিয়েও অনেক সময় চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার মিলছে না বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তারা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে বলেই নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে আমদানির পরিমাণের তথ্যও বলছে, দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলপিজি আসছে। তাহলে সংকট না থাকার পরও কেন বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের, আর কেনই বা চাহিদামতো পণ্য মিলছে না— এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসছে বাজার তদারকির বিষয়টি। অবশ্য আজ ১ অক্টোবর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নতুন দাম নির্ধারণ করার কথা রয়েছে। যদিও নতুন দাম বাজারে কখনোই কার্যকর হওয়ার নজির নেই।

এদিকে বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বন্ধ রাখার মেয়াদ আগামী নভেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে কাতার। এজন্য দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে কোনো ঘাটতি হবে না বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ কর্পোরেশন (পেট্রোবাংলা)। চাহিদা অনুযায়ী আগামী দুই মাসে মোট ১৯ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হবে। এর মধ্যে অক্টোবরে আসবে ১০ কার্গো আর নভেম্বরে ৯ কার্গো। পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল সূত্র জানায়, এ মাসে ১০ কার্গোর মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে ৩ কার্গো আনা হবে। আর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসবে ২ কার্গো। এছাড়া স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসবে ৫ কার্গো। আর নভেম্বরে ৯ কার্গো এলএনজির মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ৬ কার্গো এবং স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসবে ৩ কার্গো। যুক্তরাষ্ট্র, নাইজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এসব এলএনজি কেনা হয়েছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান বলেন, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে চাহিদা অনুযায়ী মোট ১৯ কার্গো এলএনজি নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে এলএনজি থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা গ্যাস নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। পেট্রোবাংলার পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, চাহিদা অনুযায়ী আমদানি নিশ্চিত হওয়ায় আগামী কয়েক মাস এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হবে না।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিল্প, বিদ্যুৎ ও বাসাবাড়ি মিলে দৈনিক প্রাকৃতিক গ্যাসের মোট চাহিদা চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে দেশীয় উত্তোলন ও আমদানিকৃত এলএনজি মিলে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে গড়ে মাত্র ২৬শ মিলিয়ন ঘনফুট। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় সাশ্রয়ী মূল্যে তা আমদানি করতে বেকায়দায় পড়েছে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটি। ফলাফলস্বরূপ, বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ না থাকায় এবং ২০১৫ সাল থেকে নতুন সংযোগ বন্ধ থাকায় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও সাধারণ পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। হঠাৎ করেই এই অতিরিক্ত গ্রাহকের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বেসরকারি এলপিজি অপারেটররা।

আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেনের সৌদি আরামকো ঘোষিত চুক্তিমূল্যের (সৌদি সিপি) ওপর ভিত্তি করে দেশে প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। সেপ্টেম্বরের সৌদি সিপির ওপর ভিত্তি করে কমিশন ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়েছিল। কিন্তু বিইআরসির এই হিসাব বাস্তবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে বিইআরসি কর্তৃক নির্ধারিত ‘জাহাজ ভাড়া’র কারণে। বিইআরসি দাম নির্ধারণের সময় প্রতি টন এলপিজির ফ্রেইট বা জাহাজ ভাড়া ১৬০ ডলার হিসেবে ধরে থাকে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে এই ভাড়া এখন প্রতি টনে ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে। উদ্যোক্তারা জানান, বাড়তি ভাড়ায় এলপিজি আমদানি করে সরকারি কম দামে বিক্রি করলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশাল লোকসান গুনতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ইউরোপ বা ধনী দেশগুলোর মতো বেশি দামে গ্যাস কেনায় পিছিয়ে পড়ছেন দেশীয় ব্যবসায়ীরা, যা সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম করেছে।

ঢাকা শহরে এলপিজির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি দেখতে গতকাল এ প্রতিবেদক বেশ কয়েকটি স্থানে গিয়েছেন। বিক্রেতাদের কথায় মোটাদাগে সরবরাহ সংকটের বিষয়টি উঠে আসে। মোহাম্মদপুর ঢাকা উদ্যান এলাকার রাব্বি ইলেকট্রিক অ্যান্ড হার্ডওয়্যারের প্রোপ্রাইটার মিজানুর রহমান মিজান বলেন, বাজারে সরবরাহ কম থাকায় ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। এ কারণে দাম কিছুটা বেড়েছে। তিনি জানান, ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৮৫০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করেছেন। আর সেটি এখন ২ হাজার ২৩০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। মিরপুরের একজন এলপিজি ব্যবসায়ী জানান, এক সপ্তাহের ব্যবধানে এলপিজির দাম ৩০০-৪০০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করছেন।

রাজধানীর কমলাপুরে একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দোকানে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে গিয়েছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী শামসুল ইসলাম। তিনি জানতে পারেন, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৩০০ টাকা। অথচ এর আগে একই সিলিন্ডার তিনি কিনেছিলেন ১ হাজার ৬৫০ টাকায়। বাড়তি দাম নিয়ে দোকানির সঙ্গে দর-কষাকষি করে অবশেষে ২ হাজার ২৫০ টাকায় নেন। তার মতো আরো কয়েকজন ক্রেতা বাড়তি দামে সিলিন্ডার নেওয়ার জন্য দোকানে ভিড় করছিলেন। বাড়তি দামের একই অভিযোগ করেন মিরপুরের বাসিন্দা মাইনুল হাসান পিন্নু। ফেসবুকে তিনি পোস্ট করেন বাড়তি দামেও মিলছে না এলপিজি সিলিন্ডার। কয়েক দোকান ঘুরে ২ হাজার ৩০০ টাকায় কিনছেন ১২ কেজির সিলিন্ডার গ্যাস।

এলপিজির এই অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি শুধু গৃহিণীদের রান্নাঘরের বাজেটেই আঘাত হানেনি, বরং এর বহুমাত্রিক পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে পুরো মূল্যস্ফীতিতে। মোড়ের টি-স্টল, মাঝারি হোটেল ও বেকারিগুলো বাধ্য হয়ে খাবার ও নাস্তার দাম বাড়িয়ে দিয়েছে; কারণ সিলিন্ডারপ্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বাড়তি খরচের ধাক্কা সরাসরি খাবারের দামে গিয়ে পড়ছে। পাশাপাশি যেসব সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি কম খরচে চলার জন্য ‘অটো গ্যাসে’রূপান্তরিত হয়েছিল, সেগুলো অটোগ্যাস স্টেশনে সরবরাহ কম থাকায় এবং চড়া দামে গ্যাস কিনতে থাকায় যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া হাঁকাচ্ছে। এছাড়া মূল সরবরাহ সংকটের সুযোগে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ পুরনো সিলিন্ডারে অনিরাপদ উপায়ে গ্যাস রিফিল করে চড়া দামে বিক্রি করছে, যা জননিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে। কাপ্তানবাজার এলাকার এলপিজি বিক্রেতা জসিম উদ্দিন বলেন, আমাদের অনেক সিলিন্ডার খালি। ডিলাররা গ্যাস দিচ্ছে না। গত তিন দিন ধরে প্রতি সিলিন্ডারে ৫-৭শ টাকা দাম বেড়েছে।

রামপুরার চা-দোকানি মনির হোসেন বলেন, বাজারে হঠাৎ এলপি গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে। চলতি মাসের শুরুতে তিনি ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডার কিনেছিলেন ১ হাজার ৬০০ টাকায়। গতকাল ওই সিলিন্ডার কিনতে হলো ২ হাজার ২৫০ টাকায়। এত দামি গ্যাস জ্বালিয়ে দীর্ঘ সময় চায়ের পানি গরম রাখতে গেলে লোকসান হবে। বাধ্য হয়ে তিনি বাসা থেকে পানি গরম করে ফ্লাক্সে ভরে নিয়ে এসেছেন। যাত্রাবাড়ীর দনিয়াতেও ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৩০০ টাকা। দনিয়ার রসুলপুরের এক বাসিন্দা জানান, গতকাল তিনি ৩৫ কেজির সিলিন্ডার না পেয়ে ৩৩ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডার কিনেছেন সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায়। গত আগস্টে ৩৫ কেজির সিলিন্ডার কিনেছিলেন ৫ হাজার ৪০০ টাকায়। বিইআরসির সেপ্টেম্বরের জন্য নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী ৩৩ কেজি গ্যাসের দাম ৪ হাজার ৩৬০ টাকা। ওই ক্রেতা বলেন, বাড়তি দামের বিষয়ে জানতে চাইলে দোকানি বলেছেন, সরবরাহ নেই। তাই দাম বেশি। তাঁর দোকানে ৩৩ কেজির সিলিন্ডারও নেই। অন্য জায়গা থেকে জোগাড় করে দেবেন।

যদিও বিক্রেতাদের দাবি, বাজারে এলপিজির সংকট নেই। তবে ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা বলছে, নির্ধারিত দামে তো নয়ই, বাড়তি দাম দিয়েও অনেক সময় প্রয়োজনীয় সিলিন্ডার সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। একজন ক্রেতা বলেন, যে ডিলারের কাছে যাচ্ছি, তার কাছেই নাকি সিলিন্ডার নেই। ফলে মানুষ নিরুপায়। রান্না করতে হবে, খেতে হবে এ কারণে এলপিজির কোনো বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়েই বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে। বিক্রেতাদের বক্তব্য, তারা নিজেরাই বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনছেন। ফলে বিইআরসির নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে লোকসান গুনতে হবে। একজন বিক্রেতা বলেন, আমরা ১ হাজার ৬৫০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনছি, অথচ সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। বিইআরসির নির্ধারিত দামের সঙ্গে কোম্পানির দামেরও পার্থক্য রয়েছে। ফলে ওই দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণেই আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধিতে এলপিজির বাজারে চলছে চরম অস্থিরতা। এর অন্যতম কারণ সারা দেশে এই বিশাল বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে মাত্র ১০টি কোম্পানি। এর মধ্যে মাত্র চারটি কোম্পানি এলপিজির বাজারের ৬৮ শতাংশ সরবরাহ দিচ্ছে। অথচ চালু আছে ২৯টি কোম্পানি। বাকি কোম্পানিগুলো ঋণখেলাপি বা অন্যান্য সমস্যার কারণে এলপিজির আমদানির জন্য এলসি করতে পারছে না। তাই এলপিজির বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি করতে বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এলসি করার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। গত সোমবার সচিবালয়ে এলপিজি সরবরাহ নিয়ে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-লোয়াবের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এলপিজির অপারেটরদের বলা হয়, বাজারে এলপিজির কোনো সংকট নেই। কিন্তু বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসির বেঁধে দেওয়া দাম অর্থাৎ ১ হাজার ৫৮৫ টাকায় কোথাও এলপিজির ১২ কেজির সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। বৈঠকে বলা হয়, গত আগস্ট মাসে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন। আর ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন। সুতরাং আমদানির প্রবণতা অনুযায়ী এই মাসে এলপিজির কোনো ঘাটতি হবে না।

এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপি গ্যাস ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটির নেতার দাবি, অধিকাংশ কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করতে পারছে না। এ কারণে বাজারে সরবরাহ নিয়ে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এলপি গ্যাস ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের ট্রেজারার আবু তাহের খোরশেদ বলেন, পাঁচ দিন, সাত দিন, এমনকি আট দিন অপেক্ষা করে রেশনিং করে আমাদের মাল আনতে হয়। অনেক কোম্পানির কাছে সম্পূর্ণভাবে গ্যাস না থাকায় বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ভোক্তা অধিকারকেও অবহিত করা হয়েছে। তারা আমাদের বলেছে, নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিষয়টি মনিটরিং করা হবে।

এলপিজির সরবরাহ ও দামের এই পরিস্থিতির কারণ কোথায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ব্যবসায়ীরা একদিকে বেশি দামে পণ্য কেনার কথা বলছেন, অন্যদিকে ভোক্তারা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনছেন। আবার বাড়তি দাম দেওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। কোন জায়গায় সমস্যা হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে সরকারকে এ বিষয়ে সমাধানে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, এলপিজির বাজার দেখভালের জন্য সরকারের একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্ধারিত হিসাব অনুযায়ী দাম কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদের।

সরেজমিন বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, এলপিজি সংকটের কথা বলে ভোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন খুচরা বিক্রেতারা। দাম কেন বেশি রাখা হচ্ছে জানতে চাইলে খুচরা বিক্রেতারা দুষছেন পরিবেশক ও ডিলারদের। আবার পরিবেশক ও ডিলাররা অভিযোগ করছেন, অপারেটরদের কাছ থেকে চাহিদা অনুসারে সরবরাহ পাচ্ছেন না তারা। সেই সঙ্গে এলপিজি পরিবহনে ট্রাক ভাড়া বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে পণ্যটির দামে। অপারেটররা বলছেন, তারা বিইআরসি নির্ধারিত দামেই বাজারে এলপিজি সরবরাহ করছেন এবং বাজারে পণ্যটির পর্যাপ্ত সরবরাহও রয়েছে। তবে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে অন্তত দুজন অপারেটর জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা এবং লোহিত সাগরে প্রতিবন্ধকতায় বিশ্বব্যাপী এলপিজি সরবরাহ কমে গেছে। সেই সঙ্গে সিপি প্রাইস (এলপিজির প্রতি মাসে সৌদি ঘোষিত দাম) ফ্রেইট কস্ট ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় উচ্চ মূল্যে পণ্য আমদানি করে লোকসানের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। স্পট মার্কেটেও কার্গোর দাম অনেক বেশি। এ কারণে অনেক অপারেটর আমদানি কিছুটা কমিয়েছেন। আগামীতে এ পরিস্থিতি বজায় থাকলে এবং রেগুলেটরি কমিশন এলপিজি আমদানিতে প্রিমিয়াম না বাড়ালে অনেক অপারেটর পণ্য আমদানি কমাতে পারেন। এরই মধ্যে বিইআরসিতে প্রিমিয়াম বাড়ানোর জন্য একটি অপারেটর আবেদন জানিয়েছে।

বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রকৌশলী সিরাজুল মাওলা বলেন, এলপিজি সংকটে দেশের ৭০ শতাংশ অটোগ্যাস স্টেশন বন্ধ। অটোগ্যাসের সরবরাহ চেয়ে আমরা দফায় দফায় চেষ্টা করেও নিশ্চয়তা পাচ্ছি না। আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে বিইআরসিতে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছি। এভাবে চলতে থাকলে অটোগ্যাস খাত মুখ থুবড়ে পড়বে। দেশের এলপিজি সেক্টরে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসা পরিচালনা করছে ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ইস্ট কোস্ট গ্রুপের সাবসিডিয়ারি। গ্রুপটির চেয়ারম্যান ও শিল্প উদ্যোক্তা আজম জে চৌধুরী বলেন, দেশে এলপিজির আমদানি সংকট রয়েছে বলে মনে করি না। তবে বিশ্ববাজারে প্রাইসিং নিয়ে যেহেতু বিইআরসি দাম সমন্বয় করে, ফলে অনেকেই মজুদ করার সুযোগ নিতে পারেন। যেটাকে আমরা কৃত্রিম সংকট বলতে পারি। অপারেটরা সবসময় চেষ্টা করে যাচ্ছেন দেশে যেন এলপিজির সংকট তৈরি না হয়।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, এলপিজি আমদানিতে আমরা কোনো সংকট দেখছি না। বাজারে যে সংকট তৈরি হচ্ছে তা অপারেটরদের পরের স্তরগুলোতে (পরিবেশক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা) হচ্ছে। এটা কৃত্রিম সংকট। এ সংকট দূর করার কাজ অপারেটরদের নয়, এটা মাঠ পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে করতে হবে। বিইআরসিকে বিষয়টি তদারক করতে হবে। সেই সঙ্গে এলপিজি আমদানিতে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে যেসব জটিলতা রয়েছে সেগুলো দূর করতে হবে। দেশের বাজারে এলপিজি বাড়তি দামে বিক্রি ও সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করেনি বিইআরসি। জানতে চাইলে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বাজারে এলপিজির সংকট রয়েছে এটা আমরা শুনছি। তবে আমদানি যে কম হয়েছে সেটা কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। গত মাসে দেশে এলপিজি এসেছে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন। এ মাসে এখন পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার টন। তবে ইন্টারন্যাশনাল মার্কেট থেকে এলপিজি আমদানিতে ফ্রেইট কস্ট বেড়েছে। আমরা এটা আগে কমিয়েছিলাম। এটা আমরা অবশ্যই বিবেচনা করব। এর বাইরে এলপিজি সাপ্লাই শর্টেজ অভ্যন্তরীণ কোনো কারণেও হতে পারে।

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চাহিদা অনুসারে গত মাসে ১৪টি অপারেটরের অনুকূলে এলপিজি আমদানির অনুমোদন ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার টনের মতো। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন, যা চাহিদার চেয়েও বেশি। চলতি মাসে আমদানি অনুমোদন রয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার টন, ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এলপিজি এসেছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন। এ মাসে আরো বেশ কয়েকটি জাহাজ আসার কথা বলছেন অপারেটররা। তবে আগের মাসের তুলনায় আমদানি কমতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা। সব মিলিয়ে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৬৯৪ টন এলপিজি এসেছে। দেশের বাজারে ৯৮ শতাংশ এলপিজি আমদানি করে বেসরকারি অপারেটররা। আমদানি করা এলপিজির ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় বাসাবাড়িতে এবং ১২ শতাংশ শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। ৫ শতাংশ যানবাহনে ও অন্যান্য খাতে ৩ শতাংশ।

এলপিজির বাজার ১০ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে এলপিজি বিক্রির জন্য সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়েছে ৬০টি কোম্পানি। এর মধ্যে চালু আছে মাত্র ২৯টি কোম্পানি। এর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি কেবল আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলপিজি আমদানির এলসি করছে। জ্বালানি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী এই সেপ্টেম্বর মাসে (এখন পর্যন্ত) ইউনাইটেড আই গ্যাস লিমিটেড ২৩ হাজার ৪৩২ হাজার টন, যমুনা স্কেটেক ২০ হাজার ৬০২ টন, পেট্রোমেক্স এলপিজি লিমিটেড ১০ হাজার ৬০০ টন, ওমেরা পেট্রোলিয়াম ১৪ হাজার ৩০১ টন, মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি ১৩ হাজার ৪০১ টন, সান গ্যাস (সাবেক লাফ) ৮ হাজার ৪০০ টন, টিএমএসএস এলপিজি ৩ হাজার ৩০০ টন, এসকেএস এলপিজি ৪ হাজার ১ টন, বিএম এনার্জি ১৮ হাজার ২৫২ টন এবং প্রিমিয়াম এলপি গ্যাস লিমিটেড ২ হাজার ৪৫০ টন এলপিজি আমদানি করেছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী আগস্ট মাসেও ১৩টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করেছে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে এ সংখ্যা ১০টিতে নেমে এসেছে। কেন তিনটি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করেনি সে ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে চাহিদার ৯৮ শতাংশের বেশি সরবরাহ করে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। সুতরাং এ খাতে বড় ধরনের প্রতিযোগিতা না থাকলে সাধারণ গ্রাহকদের জিম্মিদশা কাটবে না। জেএমআই এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, জেএমআই বেশি করে এলপিজি আমদানি করে বাজারে সরবরাহ করতে চায়। কিন্তু ব্যাংকের নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে এখন এলসি করা যাচ্ছে না। এই মুহূর্তে আগ্রহী কোম্পানিগুলোকে এলপিজি আমদানির সুযোগ করে দিলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে। জ্বালানি বিভাগ গত কয়েক মাসের এলপিজি আমদানির পরিসংখ্যান যাচাই করে দেখেছে, ওমেরা পেট্রোলিয়াম বাজারের ১৯ শতাংশ এলপিজি সরবরাহ করে। এরপর পেট্রোম্যাক্স ১৭ শতাংশ, মেঘনা গ্রুপ ১৬ শতাংশ এবং যমুনা স্পেসটেক ১৬ শতাংশ অর্থাৎ এই চার কোম্পানি ৬৮ শতাংশ এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এর বাইরে বিএম এনার্জি ৮ শতাংশ, ইউনাইটেড আইগ্যাস ৭ শতাংশ এবং ডেল্টা মাত্র ৪ শতাংশ চাহিদার এলপিজি সরবরাহ করছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর দেশে এলপিজির চাহিদা ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন। ২০৩৫ সালে এই চাহিদা বাড়তে পারে ৪০ লাখ টনে। দেশে এলপিজির ৮০ শতাংশ ব্যবহার হয় রান্নার কাজে। এরপর ১২ শতাংশ শিল্প বা বাণিজ্যিক খাতে। যানবাহনে ৫ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ব্যবহার হয় ৩ শতাংশ।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin