অস্ট্রেলিয়ায় ভিসার মেয়াদ শেষ হলেই আটক ও বহিষ্কারের কড়া নিয়ম

Published: September 17, 2026, 9:42 am

অস্ট্রেলিয়ায় বৈধ ভিসা ছাড়া অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে দেশটির সরকার। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যারা থেকে যাচ্ছেন, তাদের আটক ও বহিষ্কারের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক। বৃহস্পতিবার ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে দেওয়া এক ভাষণে তিনি অভিবাসন কর্মসূচির 'বিশ্বাসযোগ্যতা' ফিরিয়ে আনতে একগুচ্ছ সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরেন। বার্ক স্পষ্ট জানিয়েছেন, সাময়িকভাবে এলে সাময়িক ভিসা, স্থায়ীভাবে এলে স্থায়ী ভিসা, আর বৈধ ভিসা না থাকলে অস্ট্রেলিয়া ছাড়তে হবে।

সরকারের এই অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য হলো নিট ওভারসিজ মাইগ্রেশন বা এনওএম (NOM) নিয়ন্ত্রণ করা। চলতি বছরে এনওএম-এর সংখ্যা ২ লাখ ৪৫ হাজার এবং আগামী অর্থবছরে ২ লাখ ২৫ হাজার নির্ধারণ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের সর্বশেষ মার্চ মাসের হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে দেশটির নিট অভিবাসন কমে ২ লাখ ৯২ হাজার ১০০-তে দাঁড়িয়েছে। আবাসন সংকটের কারণে এই এনওএম লক্ষ্যমাত্রাকে এখন কেবল পূর্বাভাস নয়, অর্জনযোগ্য লক্ষ্য হিসেবে দেখছে সরকার। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করেছেন যে, অভিবাসন অতিরিক্ত কমিয়ে আনলে তা দেশটির সেবা খাত ও অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

অভিবাসন ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা 'ভিসা হপিং' বন্ধে কঠোর হচ্ছে প্রশাসন। স্থায়ী বসবাসের সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও অনেকে এক ভিসা থেকে অন্য ভিসায় গিয়ে আপিল প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। এই প্রবণতা ঠেকাতে এখন ভিজিটর ভিসাতেও সাধারণভাবে 'নো ফারদার স্টে' শর্ত যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে পর্যটক হিসেবে এসে দেশের ভেতর থেকেই অন্য ভিসায় যাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হবে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসছে। নতুন শিক্ষার্থী ভিসার সাথে পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় আনার সুযোগ আর থাকছে না। তবে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা পরিবারগুলোকে বিচ্ছিন্ন করা হবে না। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, আসিয়ানভুক্ত দেশ এবং পিএইচডির মতো নির্দিষ্ট কিছু কোর্সের ক্ষেত্রে এই নিয়মে ব্যতিক্রম থাকবে। এছাড়া, এক কোর্স শেষ করে অন্য কোর্সে যেতে হলে নতুন ভিসা লাগবে এবং পরবর্তী কোর্সটি অবশ্যই আগেরটির চেয়ে উচ্চতর যোগ্যতার স্তরের হতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘুরে ঘুরে পড়াশোনার নামে দীর্ঘ সময় অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থাকে অভিবাসনের পথ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করাই এর উদ্দেশ্য।

'ওয়ার্কিং হলিডে মেকার' বা ব্যাকপ্যাকারদের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বছর অবস্থান করার সুযোগ সর্বোচ্চ ৪৫ হাজারে সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে। এই সুযোগ পেতে আঞ্চলিক এলাকায় ৮৮ দিন কাজ করার পর লটারি বা ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচিত হতে হবে। আর তৃতীয় বছরের জন্য সুযোগ পাবেন মাত্র ৫ হাজার জন, যার জন্য আঞ্চলিক এলাকায় ছয় মাস কাজ করার শর্ত রয়েছে। গত বছর প্রায় ৫৭ হাজার ব্যাকপ্যাকার দ্বিতীয় বছর এবং প্রায় ৩১ হাজার তৃতীয় বছর অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন। তবে যুক্তরাজ্য-অস্ট্রেলিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারণে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের জন্য আঞ্চলিক এলাকায় কাজের এই বাধ্যবাধকতা থাকবে না এবং তাদের আবেদন দ্রুত প্রক্রিয়াকরণও করা হবে না।

অভিবাসন কমানোর পাশাপাশি দক্ষ কর্মী আনার প্রক্রিয়া দ্রুত করতে 'পয়েন্টস টেস্ট' পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আবাসন নির্মাণ খাতের পেশাগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির সমতুল্য গুরুত্ব দেওয়া হবে। তাছাড়া, 'মিনিস্টেরিয়াল ডিরেকশন ১১৯' পরিবর্তন করে নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, মৎস্য ও শিক্ষকতা খাতের আবেদনগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যা আগে প্রক্রিয়াকরণের তালিকার শেষে পড়ে থাকায় নিষ্পত্তিতে এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যেত।

ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের ধরতে ১০০ জন অতিরিক্ত কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা নিয়োগ এবং আটকের জন্য ২৫০টি নতুন শয্যা যুক্ত করা হচ্ছে। মেলবোর্নের সাবেক কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্রটিকেও এই কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২০১৫ সালের আগের একটি ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন, যেখানে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া ব্যক্তিদের আটক করে ব্রিজিং ভিসা দেওয়া এবং দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হতো, যাতে তারা শেষ পর্যন্ত নিজ উদ্যোগেই অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে যান।

অভিবাসন সংস্কারের অংশ হিসেবে ভিত্তিহীন বা দুর্বল 'প্রোটেকশন ভিসা' বা আশ্রয় আবেদন ঠেকাতে নতুন আইন আনা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কিছু মানুষ অন্য ভিসার সুযোগ শেষ হলে দীর্ঘ সময় থাকার উদ্দেশ্যে দুর্বল আশ্রয় আবেদন করেন, যা প্রকৃত আবেদনকারীদের প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করে। এমন কিছু দেশ রয়েছে যেখান থেকে করা প্রোটেকশন ভিসা আবেদনের ৮৫ শতাংশের বেশি প্রত্যাখ্যাত হয় এবং এই দেশগুলোর আবেদনকারীরাই মোট প্রক্রিয়াধীন আবেদনের প্রায় ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী। এছাড়া 'এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট' ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার চাহিদার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীসহ নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের আগমন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin