দেশের কারিগরি শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। টানা তিন বছর শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়া ২৪৬টি বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৭টি ডিপ্লোমা পর্যায়ের এবং ১০৯টি এইচএসসি (বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি বা বিএমটি) পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রুহুল আমিন জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে আরও ১১২টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করাসহ তাদের পাঠদানের অনুমোদন বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বোর্ডের রেকর্ড অনুযায়ী, ভোকেশনাল শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন পাওয়া ৩ হাজার ৪৪০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬২১টি প্রতিষ্ঠানে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে আগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৪৪৩টি এসএসসি (ভোকেশনাল) এবং ১৭৮টি দাখিল (ভোকেশনাল) পাঠদানের অনুমোদনের আওতাভুক্ত। কারিগরি বোর্ডের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নোটিশের জবাবের ভিত্তিতে তালিকা চূড়ান্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে পাঠদানের অনুমতি বাতিলসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নতুন করে আরও ৮৬টি ডিপ্লোমা এবং ২৬টি এইচএসসি (বিএমটি) পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে ২০২৭-২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে ভর্তি কার্যক্রম স্থগিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং ১ অক্টোবরের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। নিয়মানুযায়ী, পরপর তিন বছর শিক্ষার্থী ভর্তি না হলে বা ফলাফল, অবকাঠামো, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, ব্যবস্থাপনা কমিটি, আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি ও লাইব্রেরির মতো শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে পাঠদানের অনুমোদন বাতিল করার বিধান রয়েছে।
রংপুর সদরের মহাদেবপুর এলাকার বিসিই মোড়ের মেট্রোপলিটন প্রাইভেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যারা কারণ দর্শানোর নোটিশ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিন শিক্ষাবর্ষ ধরে তাদের প্রতিষ্ঠানে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি, তবে আগে ভর্তি হওয়া কিছু শিক্ষার্থী এখনো রয়েছে। তিনি দাবি করেন, তারা এখনো বোর্ডের কোনো নোটিশ পাননি।
কারিগরি শিক্ষার মান নিয়ে সংশ্লিষ্টরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, পরিকল্পনা ছাড়াই বিপুলসংখ্যক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়ায় শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা আগ্রহ হারাচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১ হাজার ৯০০টি এইচএসসি (বিএমটি) ও ৬০০টি ডিপ্লোমা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ১২ হাজার ৯৩২টি প্রতিষ্ঠানে কারিগরি শিক্ষা দেওয়া হয়। সরকারি লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করা। তবে বর্তমানে বিপুল আসন ফাঁকা থাকার চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি পলিটেকনিকগুলোতে ১ লাখ ৬০ হাজার আসনের বিপরীতে মাত্র ৩০ হাজার ৬১৪ জন ভর্তি হয়েছে। সামগ্রিকভাবে কারিগরি শিক্ষায় ১৯ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি আসনের বিপরীতে ভর্তি হয়েছে পৌনে ১০ লাখ শিক্ষার্থী।
দেশে বর্তমানে ৫৬টি সরকারি ও ৬১২টি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে এসব কোর্স পরিচালিত হয়।





