লিটারে ২০ টাকা বাড়ল জ্বালানির দাম, চরম সংকটে সাধারণ মানুষ

Published: September 22, 2026, 2:49 am

জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে রোববার রাতে নতুন এই মূল্য তালিকা প্রকাশের পর সোমবার থেকেই তা কার্যকর হয়েছে। হঠাৎ করে জ্বালানির এই নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন করে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি থেকে শুরু করে কৃষি, শিল্প উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ—সব খাতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া পেট্রোলের দাম ১৪০ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৬০ টাকা এবং অকটেনের দাম ৪৫ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৫ টাকায়। এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে সোমবার সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়তি গণপরিবহন ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সিএনজি অটোরিকশা, রাইড শেয়ারিংয়ের চালক ও সাধারণ পথচারীসহ সব শ্রেণির মানুষ যাতায়াত খরচ নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের চলমান মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেবে। কৃষিখাতে সেচ, যান্ত্রিক চাষাবাদ ও পণ্য পরিবহনে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে যাবে। এর ফলে মাঠ থেকে আড়ত, পাইকারি বাজার হয়ে খুচরা পর্যায়ে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শিল্পখাতেও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির বড় শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে শিল্প, লজিস্টিকস ও সেবা খাতের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এতে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে。

অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান সতর্ক করে বলেছেন, পরিবহন ও শিল্পোৎপাদনের বাড়তি ব্যয়ের চূড়ান্ত বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই চাপবে। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের বড় অংশ জীবনযাত্রার পেছনে ব্যয় করতে গিয়ে তীব্র সংকটে পড়বে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সাধারণ মানুষ গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেই এই চাপ আরও তীব্র হবে। তিনি উল্লেখ করেন, তেলের দাম যতটুকু বাড়ে, বাস্তবে পরিবহন ভাড়া ও পণ্যের দাম তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি বাড়ানো হয়। তাই অসাধু চক্র যেন এর সুযোগ নিতে না পারে, সেজন্য সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। এছাড়া হঠাৎ এভাবে দাম না বাড়িয়ে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) মতো স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘অপরিণামদর্শী’ ও অযৌক্তিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, অতীতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রচুর মুনাফা করেছে। সেই অর্থ ব্যবহার না করে কিংবা অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ না করে একবারে ২০ টাকা দাম বাড়ানো সাধারণ মানুষের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও অবিলম্বে এই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ও ফ্রেইট চার্জ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। এছাড়া চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক ক্ষতি কমানো এবং সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি পাচার রোধ করতেই এই মূল্য সমন্বয় জরুরি ছিল।

এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ স্থলবন্দর যশোরের বেনাপোলে। বন্দর থেকে দেশের অভ্যন্তরে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ট্রাকভাড়া এক ধাক্কায় ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। বেনাপোল দিয়ে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ শতাধিক আমদানিবাহী ট্রাক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করে। বেনাপোল ল্যান্ড পোর্ট ইমপোর্টার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান জানান, সোমবার থেকে ট্রাকমালিকরা প্রতি ট্রাকে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা বেশি ভাড়া দাবি করছেন। রোববার যেখানে বেনাপোল থেকে ঢাকায় ১৫ টন পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাকভাড়া ছিল ২১-২২ হাজার টাকা, সেখানে সোমবার থেকে চাওয়া হচ্ছে ২৫-২৬ হাজার টাকা। আমদানিকারকরা আশঙ্কা করছেন, এই বাড়তি পরিবহন খরচের দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই গিয়ে পড়বে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin