জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: অর্থনীতির ওপর বহুমুখী চাপের শঙ্কা

Published: September 21, 2026, 5:56 am

জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কেবল পেট্রলপাম্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর অভিঘাত অর্থনীতির প্রায় সব খাতে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়বে। দেশে এমনিতেই কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি বেশি, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা চাপের মুখে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল। এমন এক পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো। এখন বড় প্রশ্ন হলো, এর পরোক্ষ প্রভাবে পরিবহন, খাদ্য, কৃষি, শিল্প ও সেবা খাত হয়ে সামগ্রিক মূল্যস্তরে কতটা চাপ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে, মূল্যস্ফীতির এই নতুন চাপ সামাল দেওয়ার বিষয়ে সরকারের কোনো সুস্পষ্ট কৌশল দৃশ্যমান নয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ডিজেলের গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে ডিজেলের ব্যবহার হয়। ডিজেলের দাম বাড়লে প্রথমেই পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে। বাস ও ট্রাক পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি সেচের খরচ, জেনারেটর ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি চালানোর ব্যয়ও বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীরা সাধারণত এই বাড়তি খরচের বড় একটি অংশ পণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেন। খাদ্য মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে বাজারজাত করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই পরিবহন, সেচ ও সরবরাহ খরচ জড়িত।

ব্যবসায়ী, পরিবহনমালিক ও শ্রমিকেরা যদি মনে করেন ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়তে পারে, তবে তাঁরা আগে থেকেই পণ্যের দাম ও মজুরি সমন্বয় শুরু করেন। এতে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং পরবর্তীকালে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর সামাজিক প্রভাবও অত্যন্ত গভীর। যদিও ধনী পরিবার সরাসরি বেশি জ্বালানি ব্যবহার করে, তবে নিম্ন আয়ের পরিবার পরোক্ষভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় হয়। বাসভাড়া, চাল বা সবজির দাম কিংবা রান্নার খরচ বেড়ে যাওয়া তাদের মাসিক বাজেটে বড় চাপ তৈরি করে। শহরের শ্রমজীবী মানুষ, ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল কৃষক এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, কারণ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাদের আয় সমান হারে বাড়ে না।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে সরকার অনির্দিষ্টকাল ভর্তুকি দিয়ে ভোক্তাকে চাপমুক্ত রাখতে পারে না, যা সরকারের আর্থিক পরিস্থিতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের দায় বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের ব্যয় সংকুচিত হতে পারে। তবে সমস্যাটি কেবল ভর্তুকি দেওয়া বা দাম বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। জ্বালানি খাতের অদক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, ক্রয় ও বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানির ওপর উচ্চ কর ও শুল্কের বিষয়টিও সমান গুরুত্বের দাবি রাখে। নিজস্ব ব্যয় না কমিয়ে নিয়মিত খুচরা মূল্য বাড়ানো হলে ভোক্তার ওপর কার্যত অদক্ষতার বোঝাই চাপানো হয়।

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ঋণের ব্যয় বেশি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল। জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়লে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের মুনাফার ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে, যা বিনিয়োগ স্থগিত, উৎপাদন কমানো বা কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা পিছিয়ে দেওয়ার কারণ হতে পারে। রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই নীতিগত প্রতিক্রিয়ায় কেবল দাম বাড়ানো নয়, জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছ পদ্ধতি অবলম্বন, কর কাঠামো পর্যালোচনা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিচালন ও ক্রয়পদ্ধতির অদক্ষতা দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে সবার জন্য ভর্তুকি না রেখে নিম্ন আয়ের পরিবার, কৃষি ও গণপরিবহন খাতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া অধিক কার্যকর হতে পারে। কেবল মূল্যবৃদ্ধির পথে হাঁটলে সরকারের হিসাব হয়তো সহজ হবে, কিন্তু এর মূল্য দিতে হবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, বৈষম্য বৃদ্ধি এবং দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo