ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠায় এবং জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় পরিস্থিতি সামলাতে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন দেশটির ১০ লাখ ব্যারেলের জরুরি হিটিং অয়েলের (ঘর গরম রাখার তেল) রিজার্ভ থেকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল ঋণ হিসেবে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটায় একই রিফাইনিং উৎস থেকে উৎপাদিত ডিজেলের মূল্য প্রতি গ্যালনে রেকর্ড ৬.৫০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এতে সাধারণ ভোক্তাদের তীব্র অসন্তোষ তৈরি হলে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—কংগ্রেসে দুই রাজনৈতিক দলের সিনেটররাই জরুরি মজুদ থেকে হিটিং অয়েল ছাড়ার আহ্বান জানান। আইনপ্রণেতাদের সেই আবেদনের ভিত্তিতেই প্রশাসন এই পদক্ষেপ নেয়। একই সঙ্গে সংকট মোকাবিলায় রিজার্ভ থেকে আরও তেল ছাড়ার প্রয়োজন রয়েছে কি না, তা-ও মূল্যায়ন করছে দেশটির জ্বালানি বিভাগ।
যুক্তরাষ্ট্রের এই 'নর্থইস্ট হোম হিটিং অয়েল রিজার্ভ'টি নিউ জার্সি, কানেকটিকাট, ম্যাসাচুসেটস এবং মেইন অঙ্গরাজ্যের একাধিক সাইটে সংরক্ষিত রয়েছে। ২০১২ সালে শক্তিশালী হ্যারিকেন স্যান্ডির আঘাত হানার পর এবারই দ্বিতীয়বারের মতো কৌশলগত এই জরুরি মজুদ ব্যবহার করছে ওয়াশিংটন। নিউ ইংল্যান্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবার এবং মেইন অঙ্গরাজ্যের প্রায় ৫০ শতাংশ পরিবার শীতের সময়ে ঘর গরম রাখতে এই বিশেষ হিটিং অয়েলের ওপর নির্ভরশীল।
আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন নির্বাচন সামনে রেখে হিটিং অয়েলের এই বিপুল খরচ প্রধান এক রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে জোর লড়াই চালাচ্ছে, যা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিনেট আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, মেইন অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স কঠিন পুনর্নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে, নিউ হ্যাম্পশায়ারের উন্মুক্ত আসনে ডেমোক্র্যাট ক্রিস পাপ্পাস ও রিপাবলিকান জন সুনুনুর মধ্যে শক্ত লড়াই চলছে এবং আলাস্কায় রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভান মুখোমুখি হয়েছেন ডেমোক্র্যাট মেরি পেলটোলার।
জ্বালানি খরচ কমিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস কমাতে প্রশাসন সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন মার্কিন জ্বালানি বিভাগের প্রধান ক্রিস রাইট। দপ্তরটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সংকটহীন সরবরাহ নিশ্চিত করতে খুচরা বিক্রেতা ও টার্মিনাল হোল্ডারদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই তেল দেওয়া হবে। আগামী ১৩ নভেম্বরের মধ্যে মেইন, ম্যাসাচুসেটস ও কানেকটিকাট থেকে ৩ লাখ ১৫ হাজার ব্যারেল পর্যন্ত হিটিং অয়েল সরবরাহের লক্ষ্য সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি পেনসিলভানিয়ায় উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাস নিউ ইয়র্ক এবং নিউ ইংল্যান্ডের ঘরবাড়িতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে উইলিয়ামস কোম্পানির 'কনস্টিটিউশন ন্যাচারাল গ্যাস পাইপলাইন' বাস্তবায়নেও জোর সমর্থন দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। পরিবেশগত কারণে নিউ ইয়র্ক এতদিন প্রকল্পটি আটকে রাখলেও, চলতি সপ্তাহে প্রাথমিক কাজের অংশ হিসেবে স্নায়ুযুদ্ধকালের 'ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট' তহবিল থেকে ৪ কোটি ২০ লাখ ডলারের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব আকরিক অপরিশোধিত তেলের ওপর পড়ায় তা নিয়ন্ত্রণে আনাও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আকরিক তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্য কমাতে তারা ইতোমধ্যে ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ থেকে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল ঋণ হিসেবে দিতে সম্মতি প্রকাশ করেছে। টেক্সাস ও লুইসিয়ানা উপকূলে সংরক্ষিত মার্কিন এই মূল কৌশলগত মজুদের পরিমাণ বর্তমানে ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।





