বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশগুলোর সামনে সবসময়ই এক কঠিন সিদ্ধান্তের চ্যালেঞ্জ থাকে। তিক্ত অতীত ও অস্থির বর্তমানের ভার নিয়ে তাদের ঠিক করতে হয় যে, মানবাধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে, নাকি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে অতীত পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া হবে। প্রথম পথটি বেছে নিলে দেশ রাজনৈতিক প্রতিশোধের চক্রে আটকে পড়ার ঝুঁকি থাকে, আবার দ্বিতীয় পথটি স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা মানুষের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি। ২০২৪ সালের আগস্টে ‘ছাত্র বিপ্লব’-এর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কি ব্যক্তি-নির্ভর স্বৈরশাসন থেকে বেরিয়ে এমন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দিকে এগোতে পারবে, যাকে মানুষ বৈধ বলে মনে করে—নতুন সরকারের সামনে এটিই এখন বড় পরীক্ষা।
শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধী রাজনীতিক, গণমাধ্যমকর্মী, বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর চালানো নির্মম নির্যাতন ও নিপীড়নের ঘটনা ভুলতে রাজি নন বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী ও রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেকেই। হাসিনার অনুগত ব্যক্তিদের সক্রিয় সহযোগিতায় এসব নির্যাতন চালানো হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার সমর্থকদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি রাজনৈতিক অর্থনীতির ওপর বেসামরিক ও সামরিক আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কমানো। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের গভীরভাবে প্রোথিত স্বার্থ ও উত্তরাধিকার মোকাবিলা করা এই রাজনৈতিক মেরুকরণের পরিবেশে আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
গত ২৮ অক্টোবর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে এ নিয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকারকে দায়মুক্তি দিলে আবারও ফ্যাসিবাদের মুখোমুখি হতে হতে পারে এবং ১ হাজার ৪০০ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই বিপ্লব ব্যর্থ হতে পারে। নাহিদ ইসলাম ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিরুদ্ধে বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণ, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সংস্কারে ব্যর্থতা এবং সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ তোলেন। তিনি বাংলাদেশকে ‘মাফিয়া রাষ্ট্র’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, সন্ত্রাসীরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এবং মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরাও অস্ত্র বহন করছেন। এছাড়াও মাদক সিন্ডিকেট ও এর গডফাদারদের গ্রেপ্তারে ব্যর্থতার অভিযোগও তিনি তুলেছেন।
বঙ্গোপসাগরবিষয়ক বার্ষিক সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ স্পষ্ট হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পাকিস্তান ও ভারতের সঙ্গে জটিল সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা। সরকার ও সরকারের বাইরের অনেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন অধ্যায় শুরু করতে চাইলেও হাসিনার শাসনামলের উত্তরাধিকার এবং আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত ভারতপন্থি অবস্থান এর পথে বাধা। ঢাকা এখন আঞ্চলিক সব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর কথা বলছে। ভারতকে সঙ্গে রেখে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিস্তৃত সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ।
২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে পাকিস্তান কূটনৈতিক, প্রতিরক্ষা ও শিক্ষাসংক্রান্ত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। তবে বর্তমান সরকার জানে যে, আমলাতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যে প্রোথিত ভারতপন্থি মানসিকতার পরিবর্তন সহজ নয়। তাই স্থলসীমান্ত ও নদীকেন্দ্রিক ভারতের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে। ঢাকার মূল লক্ষ্য হলো কোনো আঞ্চলিক শক্তিকে অসন্তুষ্ট না করে অভ্যন্তরীণ আর্থসামাজিক সমস্যার সমাধান, রাজনৈতিক বিষাক্ততা কমানো এবং হাসিনা আমলের নৃশংসতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা।





