রাজধানীর ব্যস্ত রাজপথ, মেট্রো স্টেশনের বন্ধ লিফট, ফুটপাত কিংবা ফ্লাইওভারের নিচে তাকালেই চোখে পড়ে এক করুণ বাস্তবতা। মলিন মুখ, উসকো-খুসকো চুল, আর চরম ধুলাবালি মাখা অপ্রকৃতিস্থ কিছু পথশিশু—যাদের অনেকে শুয়ে-বসে ঝিমায় কিংবা মুখে পলিথিন চেপে ধরে অবিরাম টেনে চলে এক মরণনেশা। ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, কারওয়ান বাজার, গাবতলী বা গুলিস্তান—সবখানেই এই ছিন্নমূল শিশুদের দলবদ্ধ উপস্থিতি আজ এক নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে। ৫-৬ থেকে ১২-১৩ বছর বয়সী পথশিশুদের মধ্যে অত্যন্ত সহজলভ্য ও মারাত্মক ক্ষতিকর এই নেশার নাম ‘ডান্ডি’। জুতা বা চামড়াশিল্পে ব্যবহৃত সিনথেটিক রাবার আঠা (যেমন ডেনড্রাইট গ্লু) পলিথিন ব্যাগে ঢুকিয়ে মুখ ও নাক দিয়ে তার উদ্বায়ী বাষ্প টেনে এই নেশা করা হয়।
এই রাসায়নিকের মূল উপাদানের মধ্যে রয়েছে টলুইন, বেনজিন ও বিভিন্ন শক্তিশালী দ্রাবক। মাত্র ২০-৩০ টাকায় ছোট কৌটা বা কয়েকজন মিলে একটি আঠার টিউব কিনে তারা সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি, ক্ষুধা, শীত এবং তীব্র শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা থেকে অবশ হয়ে থাকতে চায়। শিশুদের কাছে এটি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার নিষ্ঠুরতা থেকে সাময়িক পলায়নের এক সস্তা উপায়। হার্ডওয়্যার দোকানি আবদুল হামিদ জানান, টিউবের দাম কম হলেও পরিমাণে কম থাকে, তাই পথশিশুরা মুচি কিংবা ক্ষুদ্র ইলেকট্রিক পণ্য সারাইয়ের দোকানে কৌটা থেকে ৪০-৫০ টাকার আঠা কিনে থাকে।
উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মনরোগবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সৈয়দ ফাহীম সামস জানান, পথশিশুরা এটিকে সমস্ত কিছু থেকে নিস্তার পাওয়ার উপায় হিসেবে দেখে। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে তাদের গুরুতর মানসিক ও শারীরিক জটিলতা তৈরি হয়। কমলাপুর রেলস্টেশনে আরিফ নামের এক পথশিশু জানায়, প্রথমদিকে মাথা ঘুরালেও পরে এটি ছাড়া দম আটকানো অনুভূতি হয়। জামাল নামের আরেক পথশিশু জানায়, এই মাদক নিলে তারা ঘোরের মধ্যে চলে যায়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) এবং ইউনিসেফ-এর যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় ৭৫,০০০ পথশিশু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই ড্যান্ডি নেশায় আসক্ত। ডিএনসির গবেষণায় বলা হয়, দেশে ৫৮ শতাংশ পথশিশু মাদকাসক্ত এবং ১৪ শতাংশ শিশু ১০ বছর বয়সের আগেই মাদক সেবন করে। তুলনামূলক সহজলভ্য হওয়ায় ৩১.৭ শতাংশ গাঁজা এবং ১৫.২ শতাংশ শিশু ড্যান্ডি সেবন করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘সার্ভে অন স্ট্রিট চিলড্রেন ২০২২’ প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের ৪৮.৫ শতাংশ পথশিশু ঢাকা বিভাগে বসবাস করে, যার মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২২.৭ শতাংশ এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৮.৩ শতাংশ। এছাড়া ৮২ শতাংশ ছেলে ও ১৮ শতাংশ মেয়ে পথশিশুর অর্ধেকের বেশি ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০ পথশিশুর মধ্যে ৯টিই বিভিন্ন কাজে যুক্ত। এর মধ্যে ১৮.৪ শতাংশ ভিক্ষাবৃত্তি, ২০.৯ শতাংশ ময়লা কুড়ানো, ১৬ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন ও নির্মাণকাজ এবং ১৪.৮ শতাংশ চায়ের দোকান বা কারখানায় কাজ করে। নদীভাঙন, দারিদ্র্য ও পারিবারিক কলহের শিকার এই শিশুদের কেবল ‘অপরাধী’ হিসেবে দেখা হয়, তাদের মানসিক সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামীম আহম্মেদ জানান, ৫-১০ বছর বয়সীদের মধ্যে ড্যান্ডি গ্রহণের প্রবণতা বেশি। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহ্বুব জানান, মাদকাসক্ত পথশিশুদের জন্য ২ হাজার ৬০০ আসনের ব্যবস্থা থাকলেও স্থায়ী ভবন না থাকায় ভাড়া বাড়িতে কার্যক্রম চলছে। তবে চিকিৎসা সুবিধার অপ্রতুলতা প্রকট। দেশে মাদকাসক্তদের জন্য ৩৬২টি নিরাময় কেন্দ্র থাকলেও সরকারি কেন্দ্রে শয্যাসংখ্যা মাত্র ১৭৯টি, যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ বলেন, কেবল পুলিশ দিয়ে ফুটপাত থেকে হটিয়ে দেওয়া এর সমাধান নয়। ড্যান্ডি আসক্ত শিশুদের জন্য বিশেষ পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং এবং অবৈত্যনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি। এছাড়া হার্ডওয়্যার বা মুদির দোকানে শিশুদের কাছে সিনথেটিক আঠা বিক্রির ওপর কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাও এখন সময়ের দাবি।





