শেন ওয়ার্নকে সেলিম মালিকের ফিক্সিং প্রস্তাব ও করাচি টেস্টের সেই স্মৃতি

Published: November 4, 2026, 4:47 am

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের কথা উঠলেই পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক সেলিম মালিকের নাম সমনে চলে আসে। ১৯৯৪ সালে করাচি টেস্টে সর্বকালের অন্যতম সেরা লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্নকে তিনি যে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তা পরবর্তীতে ক্রিকেট বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শেন ওয়ার্ন তাঁর আত্মজীবনী ‘নো স্পিন’-এ উন্মোচন করেছিলেন।

ঘটনাটি ১৯৯৪ সালের পাকিস্তান সফরের প্রথম টেস্টের। সফরকারী অস্ট্রেলিয়া দলের অধিনায়ক হিসেবে মার্ক টেলরেরও সেটি ছিল প্রথম টেস্ট ম্যাচ। করাচির ব্যাটিংবান্ধব হাইওয়ে উইকেটে চতুর্থ দিনের খেলা শেষে পাকিস্তানের স্কোর ছিল ৩ উইকেটে ১৫৫। একটা সময় পাকিস্তানের জিততে দরকার ছিল ১৫৯ রান, হাতে ৭ উইকেট। ওই সন্ধ্যায় সতীর্থ স্পিনার টিম মে-র সঙ্গে রুমে অবস্থান করছিলেন ওয়ার্ন। হঠাৎই তাঁর ফোনে কল করেন তৎকালীন পাক দলপতি সেলিম মালিক। চেহারার আদলের কারণে সতীর্থদের কাছে ‘ইঁদুর’ নামে পরিচিত মালিক ওয়ার্নকে অবিলম্বে তাঁর কক্ষে যাওয়ার তাগিদ দেন।

ওয়ার্ন তাঁর রুমে যাওয়ার পর পাকিস্তানি পোশাক কুর্তা পরিহিত সেলিম মালিক মাঠের পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, পরের দিন পাকিস্তান কোনোভাবেই হারতে পারে না। ম্যাচ হারলে দেশে ক্রিকেটারদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। জবাবে ওয়ার্ন জানান যে অস্ট্রেলিয়া জয়ের জন্যই এসেছে এবং তিনি নিজে ভালো বোলিং করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তখন মালিক মূল প্রস্তাবটি নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, শেষ দিনে অফ স্টাম্পের অনেক বাইরে বাজে বোলিং করার বিনিময়ে তিনি ওয়ার্ন ও টিম মেকে নগদ ২ লাখ মার্কিন ডলার করে দিতে প্রস্তুত, যা আধঘণ্টার মধ্যে তাঁদের রুমে পৌঁছে দেওয়া হবে। এতে করে ম্যাচটি ড্র করা সম্ভব হবে।

মালিকের সেই লোভনীয় অফার সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যাখ্যান করেন ওয়ার্ন। স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তাঁরা ম্যাচটি জিততেই মাঠে নামবেন। তড়িঘড়ি করে নিজের রুমে ফিরে তিনি টিম মেকে বিস্তারিত জানান। মে প্রথমে এটিকে কৌতুক মনে করলেও ওয়ার্নের গাম্ভীর্য দেখে পরিস্থিতি বুঝতে পারেন। এরপর তাঁরা বিষয়টি দলের অধিনায়ক মার্ক টেলর ও কোচ বব সিম্পসনকে অবহিত করেন। ঘটনা শুনে বিষমিত হন টেলর ও সিম্পসন। পরে বব সিম্পসন বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি করে ম্যাচ রেফারি নিউজিল্যান্ডের জন রিডের কাছে জমা দেন, যা পরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলে (আইসিসি) পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল।

পঞ্চম দিনে ম্যাচের মোড় ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। চতুর্থ দিন একটি উইকেট নেওয়া ওয়ার্ন শেষ দিনে আরও ৪টি উইকেট শিকার করেন। একপর্যায়ে ৫৬ রান দূরে থাকতেই পাকিস্তানের ৯ উইকেটের পতন ঘটে। জো অ্যাঙ্গেলের একটি নিখুঁত রিভার্স সুইঙ্গারে ইনজামাম-উল-হক পরিষ্কার এলবিডব্লিউ হলেও আম্পায়ার আউট দেননি। শেষ ওভারে পাকিস্তানের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৩ রান। ওয়ার্নের লেগ টার্ন বল মিস করে ইনজামাম ক্রিজ ছাড়লেও উইকেটকিপার ইয়ান হিলস স্টাম্পিং হাতছাড়া করেন। বল বাউন্ডারিতে চলে গেলে অপ্রত্যাশিতভাবে জয় পেয়ে যায় পাকিস্তান।

ম্যাচটিতে চমৎকার বোলিংয়ের জন্য শেন ওয়ার্ন ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হলেও পরাজয়ের বেদনায় ভেঙে পড়েছিলেন। পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে ওঠার সময় সেলিম মালিক বিদ্রূপ করে তাঁকে বলেছিলেন, টাকাটা মেনে নিলেই ভালো হতো। পরে ২০০০ সালে বিচারপতি কাইয়ুম কমিশনের তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে সেলিম মালিক ও আতাউর রেহমানকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। ওই কমিশন এবং আদালতের কাছে সেলিম মালিক অবশ্য ওয়ার্ন ও মার্ক ওয়াহকে মিথ্যাবাদী দাবি করে ঘটনাটি অস্বীকার করেছিলেন। ২০০৭ সালে ১৪৫ টেস্টে ৭০৮ উইকেট নিয়ে অবসর নেওয়া এই স্পিন জাদুকর ২০২২ সালে থাইল্যান্ডের কো সামুই দ্বীপে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo