ভারতে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালুর বাণিজ্যিক অনুমোদন পেতে বিলম্ব হওয়ায় দেশটির শীর্ষ ধনকুবের মুকেশ আম্বানিকে সরাসরি প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করেছেন ইলন মাস্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আম্বানিই কি ভারতের আসল বস?’ ভারতে স্টারলিংকের কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন নিয়ে চলমান টানাপড়েনের মধ্যে এই মন্তব্যকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এর আগে ইলন মাস্ক অভিযোগ করেছিলেন, ভারতের কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা ‘অলিগার্ক’ গ্রাহকদের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে স্টারলিংকের প্রবেশ ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। একে তিনি ভারতীয় জনগণের বিরুদ্ধে এক ধরনের অপরাধ হিসেবেও অভিহিত করেন। পরে তিনি সরাসরি মুকেশ আম্বানির নাম উল্লেখ করেন, যার মালিকানাধীন রিলায়েন্স জিও বর্তমানে ভারতের বৃহত্তম মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর। বিবিসি এই বিষয়ে মুকেশ আম্বানি ও রিলায়েন্স গ্রুপের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলেও তারা এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি।
তবে মাস্কের এই বৈষম্যের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত সরকার। দেশটির যোগাযোগ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্যাটেলাইট যোগাযোগ খাতের নিয়মকানুন সম্পূর্ণ ন্যায্য এবং বৈষম্যহীন। বর্তমানে স্টারলিংক, ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েব এবং জিও স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনস—এই তিনটি প্রতিষ্ঠানই অনুমোদনের প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিটি সংস্থাকেই বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর আগে নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং স্পেকট্রাম বরাদ্দের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সরকারের এই জবাবে অবশ্য সন্তুষ্ট হতে পারেননি স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিশ্বের ১৬৫টিরও বেশি দেশে স্টারলিংক লাইসেন্স পেয়েছে এবং ভারতের প্রতিটি আইন ও শর্ত মেনে চলতে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ পাঁচ বছর ব্যয় করেছে। এরপরও কেন লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। উল্লেখ্য, ২০২১ সাল থেকে ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করছে স্টারলিংক।
এই বিরোধের মধ্যেই ভারতের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। রিলায়েন্স জিও এবং ভারতী এয়ারটেলও এ খাতে সেবা চালুর জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি স্টারলিংকের সাথে এই দুই প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্বও রয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে স্পেসএক্সের সঙ্গে চুক্তি করে জিও ও এয়ারটেল, যার আওতায় সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে তারা ভারতে স্টারলিংকের যন্ত্রপাতি ও সেবা বিতরণ করবে। নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ভাগাভাগির বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছিল প্রতিষ্ঠান দুটি।
সম্প্রতি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়া মোবাইল কংগ্রেসে স্টারলিংক, রিলায়েন্স জিও এবং ভারতী এয়ারটেলের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন। সেখানে মুকেশ আম্বানির ছেলে তথা রিলায়েন্স জিও ইনফোকমের চেয়ারম্যান আকাশ আম্বানি জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠান নিজস্ব স্যাটেলাইট যোগাযোগ প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টাও চলছে। মাস্কের অভিযোগ প্রসঙ্গে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেদের কাজে মনোযোগ দিতে এবং ভারতীয় গ্রাহকদের জন্য সেবা ও মূল্য তৈরি করতে চাই।’ অন্যদিকে ভারতী এয়ারটেলের চেয়ারম্যান সুনীল ভারতী মিত্তালও জানান, তাঁদের স্যাটেলাইট উদ্যোগও সরকারি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
ভারতে স্টারলিংকের প্রবেশ নিয়ে নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ২০২৪ সালে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে মাদক চোরাচালান তদন্ত এবং মণিপুরে সেনার একটি অভিযানের সময় স্টারলিংকের কিছু যন্ত্রপাতি উদ্ধারের দাবি করে। তবে মাস্ক তখন জানান, ভারতে স্টারলিংকের সেবা কখনো চালু না হওয়ায় ওই যন্ত্রপাতিগুলো তাঁর নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছিল না। এছাড়া সাধারণ গ্রাহকদের জন্য স্টারলিংকের সেবা কতটা সাশ্রয়ী হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এর আবাসিক ইন্টারনেট প্যাকেজের মাসিক মূল্য শুরু হয় ৫৫ ডলার থেকে, যা ভারতের সাধারণ পরিবারের জন্য বেশ ব্যয়বহুল হতে পারে। তবে ভারতে সেবার মূল্য এখনো ঘোষণা করেনি প্রতিষ্ঠানটি।





