শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি ও ট্রলি সংকট, অপপ্রচারের অভিযোগ

Published: October 5, 2026, 6:09 pm

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি ও অব্যবস্থাপনার চিত্র দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও এ পরিস্থিতির তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি। লাগেজ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, ইমিগ্রেশনে হয়রানি এবং মালামাল বহনের জন্য ট্রলি না পাওয়ার মতো ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। সম্প্রতি নেপালগামী তিন তরুণীকে বাধা দেওয়া এবং বিমানবন্দরকেন্দ্রিক এক অপ্রীতিকর ঘটনায় জামায়াত নেতা মেজর (অব.) আকতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়ার পর এই ভোগান্তির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিমানবন্দরের নানা সমস্যা নিয়ে প্রবাসীরা যেমন সরব হয়েছেন, তেমনি অতীতে ঘটে যাওয়া পুরোনো ঘটনার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগও উঠেছে, যার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরেজমিনে বিমানবন্দর এলাকা ঘুরে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বেশ কিছু ভিডিওর সত্যতা যাচাই করে ট্রলি সংকটের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। যদিও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, সেখানে বর্তমানে চার হাজার ট্রলি রয়েছে। তবে বাস্তবে যখন একসঙ্গে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট অবতরণ করে, তখনই তীব্র ট্রলি সংকট দেখা দেয়। এই সংকট সামাল দিতে কয়েক মাস আগে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকেও ট্রলি আনা হয়েছিল। গত ১লা অক্টোবর মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের যাত্রীদের লাগেজ পেতে দেরি এবং ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিমানবন্দরের ৮ নম্বর বেল্ট এলাকায় তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামান ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান এবং তাকে হুমকি দেন। এ সময় প্রটোকল সহকারীদের ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়ায় এক নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটে।

এই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা ও কর্মকর্তাকে হুমকির অভিযোগে জামায়াতের সহযোগী সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে পরে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে। একদিনের রিমান্ড শেষে বর্তমানে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার সময়কার বেশ কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে তাকে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে হট্টগোল করতে দেখা যায়। জানা গেছে, ওই দিন মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ওই ফ্লাইটে আখতারুজ্জামান ছাড়াও জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ জন প্রতিনিধি এবং অন্য যাত্রীরা ছিলেন। ইমিগ্রেশন শেষে তারা লাগেজ সংগ্রহের জন্য বেল্ট এলাকায় গেলে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপের কারণে ট্রলি সংকট ও দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়। লাগেজ পেতে বিলম্ব এবং জমজমের পানি সময়মতো না আসায় মূলত উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে। এ সময় জামায়াতের সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি মাহফুজা হান্নানের মেয়ে এবং সিলেটের চিকিৎসক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর ডা. ওরাকাতুল জান্নাত ফেসবুক লাইভে এসে পরিস্থিতি তুলে ধরেন, যা দ্রুত ভাইরাল হয়। উল্লেখ্য, ওরাকাতুল জান্নাতের বাবাও একজন জামায়াত নেতা এবং সিলেটে দলটির সাবেক সংসদ সদস্য প্রার্থী ছিলেন। এই অব্যবস্থাপনা নিয়ে আখতারুজ্জামান ও জামায়াতের চারজন এমপি বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগও জমা দিয়েছেন।

বিমানবন্ধের এই অব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে একটি গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। যাত্রীদের ভোগান্তির পুরোনো কিছু ভিডিও নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে বিমানবন্দরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত এ বিষয়ে বলেন, পুরোনো ভিডিও দিয়ে বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানির নামে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলা করা হলে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে, আর নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনকারীদের পুরস্কৃত করা হবে।

এদিকে, সাধারণ যাত্রীরাও প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরা গণমাধ্যমকর্মী আবুল কালাম ফেসবুকে লিখেছেন যে, দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে বিমানবন্দরে লাগেজ পেতে তার দেড় ঘণ্টা সময় লেগেছে, যার মধ্যে একটি লাগেজ খোলা এবং অন্যটি ভাঙা অবস্থায় ছিল। তার এই পোস্টটি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর দুদিন আগে সৌদি আরব থেকে আসা মফিজুল আলম নামের আরেক যাত্রী অভিযোগ করেন, দেশে নেমেই তাকে লাগেজের জন্য ৪৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়েছে এবং এরপর ট্রলি পেতে আরও দীর্ঘ সময় টানাহেঁচড়া করতে হয়েছে।

বিমানবন্ধরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, সীমিত সক্ষমতা ও প্রয়োজনের তুলনায় কম সরঞ্জাম থাকার কারণে মাঝেমধ্যে সেবার মান ব্যাহত হয়। তবে তারা এও অভিযোগ করেছেন যে, কিছু কর্মকর্তা পরিস্থিতি জটিল করতে ইচ্ছাকৃতভাবে যাত্রীদের ছোটখাটো বিষয় নিয়ে হয়রানি করে থাকেন। স্বাভাবিক সময়ে ট্রলি সংকট না থাকলেও একসঙ্গে একাধিক বড় ফ্লাইট অবতরণ করলে এই সমস্যাটি প্রকট আকার ধারণ করে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin