ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্রমাগত হামলা ও হুমকির মুখে সৌদি আরব ও ইসরাইলের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগের বিষয়টি সম্প্রতি ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মধ্যস্থতায় এই যোগাযোগ গড়ে উঠেছে বলে জানা গেছে। মূলত হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে ইসরাইলের কাছ থেকে উন্নত গোয়েন্দা তথ্য চাইছে রিয়াদ। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
হুতিদের হামলার কারণে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এটি রিয়াদের জন্য শুধু সামরিক চ্যালেঞ্জই নয়, বরং দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান বিনিয়োগ ও লজিস্টিকস কেন্দ্রে পরিণত করার অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকেও বাধাগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে, লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরজুড়ে স্যাটেলাইট নজরদারি ও সিগন্যাল গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণে ইসরাইলের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই মূল্যবান গোয়েন্দা তথ্য পেতে রিয়াদ ঠিক কতটা রাজনৈতিক মূল্য দিতে প্রস্তুত, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
ওয়াশিংটনের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হুতিদের ওপর সরাসরি হামলার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে ট্রাম্প সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে রাজি না হয়ে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। সম্প্রতি যুবরাজের সঙ্গে সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের বৈঠকের বিষয়টি সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমও নিশ্চিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা সহায়তা দিতে প্রস্তুত হলেও ইয়েমেনে নতুন কোনো অভিযানের সরাসরি দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে না।
এতদিন পর্যন্ত সৌদি আরব অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। তারা একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা ও ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ খোলা রেখেছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলেছে। কিন্তু ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি সামরিক বা গোয়েন্দা সহযোগিতা এই ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। তেহরান হুতিদের একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক কাঠামোর অংশ মনে করে। ফলে রিয়াদের এই পদক্ষেপকে ইরান তাদের বিরুদ্ধে একটি নতুন আঞ্চলিক জোট গঠনের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করবে।
এছাড়া ফিলিস্তিন ইস্যু অমীমাংসিত রেখে ইসরাইলের সঙ্গে সামরিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা আরব বিশ্বেও অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। এ কারণেই সেন্টকমের মধ্যস্থতা এখানে একটি রাজনৈতিক বাফার হিসেবে কাজ করছে। এর ফলে সৌদি আরবকে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সামরিক সম্পর্কের কথা স্বীকার করতে হচ্ছে না, আবার ইসরাইলও আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই তার আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে। ইসরাইলের জন্য এটি অত্যন্ত সুবিধাজনক, কারণ এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করার আগেই সৌদি আরবকে তাদের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
হুতিদের হামলা ও সৌদি অবকাঠামোয় নতুন হুমকির মুখে রিয়াদকে এখন একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। আগস্ট মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। অন্যদিকে ব্রিটেনের ভূমিকা শুধু সামরিক উপদেষ্টা পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই পরিস্থিতিতে শুধু ইসরাইলের পক্ষেই হুতিদের অবস্থান ও প্রস্তুতি সম্পর্কে কার্যকর তথ্য দেওয়া সম্ভব। এই গোয়েন্দা তথ্য যদি সৌদি সামরিক অভিযানে ব্যবহার করা হয়, তবে তা দুই দেশের মধ্যে একটি স্থায়ী সামরিক-গোয়েন্দা কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করবে。
তবে রিয়াদের জন্য বড় ঝুঁকি হলো, তেহরান এটিকে তাদের বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন জোটের পদক্ষেপ হিসেবে দেখলে সৌদি তেল স্থাপনা, বন্দর ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোগুলো বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। যদি এই সহযোগিতা স্থায়ী রূপ নেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা পাবে। তখন একদিকে থাকবে ইসরাইল, সৌদি আরব ও তাদের পশ্চিমা মিত্ররা এবং অন্যদিকে থাকবে ইরান ও তার সহযোগী শক্তিগুলো। যদিও ১০ বছর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক কল্পনা করা কঠিন ছিল, তবে সৌদি আরব এখনই ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের সঙ্গে চূড়ান্ত জোটে যোগ দেবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। সম্ভবত রিয়াদ দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট সামরিক সমস্যার সমাধান খুঁজছে, তবে তারা কোনোভাবেই অন্যের যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পরিণত হতে চায় না।
রুশ ফেডারেশন সরকারের অধীন ফিন্যান্সিয়াল ইউনিভার্সিটির সামাজিক বিজ্ঞান ও গণযোগাযোগ অনুষদের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিশেষজ্ঞ এবং আরইউডিএন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি অনুষদের প্রভাষকদের মতো বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদ এখনও সেই চূড়ান্ত সীমারেখা অতিক্রম না করলেও, দীর্ঘ সময়ের মধ্যে এবারই তারা সেই সীমারেখার সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছেছে। এই যোগাযোগ শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।





