দেশের কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সর্বোচ্চ উচ্চপর্যায়ের প্রতিষ্ঠান 'আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ' শিক্ষার্থীদের ওপর সব ধরনের শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের অধিভুক্ত দেশের ছয়টি কওমি মাদ্রাসা বোর্ড ও সব মাদ্রাসার উদ্দেশে এই কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ১৯ সেপ্টেম্বর আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসানের নির্দেশে এই আদেশ কার্যকর করা হয়েছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতন ও কিছু ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, শাসনের মূল লক্ষ্য হতে হবে শিক্ষার্থীর সংশোধন ও কল্যাণ, কোনোভাবেই প্রতিশোধ নয়। রাগের মাথায় কোনো শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। শাসনের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে পদ্ধতি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে—প্রথমে নম্র সতর্কতা, এরপর মৃদু ভর্ৎসনা বা শাসন। একান্ত অপরিহার্য হলে অভিভাবককে ডেকে লিখিতভাবে অবহিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। লাঠি, বেত বা অন্য কোনো যন্ত্র দিয়ে আঘাত করা, মুখমণ্ডল বা স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাত করা এবং রক্তপাত বা হাড় ভাঙার মতো যেকোনো শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একইসঙ্গে গালমন্দ, কটু ভাষা বা ঘৃণাসূচক উপনামে ডাকা বা মানসিক নির্যাতনও পরিহারযোগ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এই নির্দেশনা লঙ্ঘনকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে শরিয়ত ও প্রচলিত আইন উভয় অনুযায়ী জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।
প্রতিটি মাদ্রাসায় অবিলম্বে 'ছাত্রছাত্রী-সুরক্ষা কমিটি' গঠন বা পুনর্গঠন করে তা সক্রিয় রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই কমিটি শিক্ষার্থী বা কর্মচারীদের যেকোনো অভিযোগের তদন্ত করবে এবং সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন পেশ করবে। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযুক্তকে তদন্ত চলাকালীন দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে বিরত রাখতে হবে। কোনো মাদ্রাসা এই কমিটি গঠনে ব্যর্থ হলে বা অভিযোগ পেয়ে ব্যবস্থা না নিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ইলহাক স্থগিত বা বাতিল করা হবে।
মাদ্রাসাবিরোধী অপপ্রচার রোধে প্রতিটি বোর্ডকে নিজ নিজ অধীনে 'মাদ্রাসা মনিটরিং সেল' গঠন এবং অভিযোগ গ্রহণের জন্য আলাদা হটলাইন চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মিথ্যা অপবাদ বা মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার শিক্ষকদের আইনি সহায়তার জন্য বোর্ডগুলোকে আইনজীবী প্যানেল রাখতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে আল-হাইআতুল উলয়ার কেন্দ্রীয় হটলাইন নম্বর ০১৭০০-৭৬৩১৭৮ (হোয়াটসঅ্যাপ) এ যোগাযোগের সুযোগ রাখা হয়েছে।
নির্দেশনা তৈরিতে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী ও শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া কান্ধলভীসহ ওলামায়ে দেওবন্দের রচনাবলি এবং প্রসিদ্ধ দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোর ফতোয়া অনুসরণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি মাদ্রাসায় নিয়মিত ইসলাহি মজলিশ, নতুন শিক্ষকদের জন্য তারবিয়াতি মজলিশ এবং অভিভাবক-সমাবেশ আয়োজনের মাধ্যমে আস্থার সম্পর্ক উন্নয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২০১৮ সালে দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমমানের স্বীকৃতির আইনি বৈধতা দেওয়া হয়।
ওই বছর ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর অধীন ‘কওমি মাদ্রাসাগুলোর দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল)-এর সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি)-এর সমমান প্রদান আইন, ২০১৮ করা হয়।আল-হাইআতুল উলয়ার নির্দেশনায় বলা হয়, শাসনের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে শিক্ষার্থীর সংশোধন ও কল্যাণ।





