পার্বত্য তিন জেলায় বছরে ৬১০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি

Published: November 7, 2026, 3:27 am

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটিতে প্রশাসনের নজরদারির বাইরে থেকে স্থানীয় তিনটি সশস্ত্র সংগঠন বছরে অন্তত ৬১০ কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করছে। বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই আশঙ্কাজনক তথ্য। প্রতিবেদনে জানানো হয়, এই চাঁদাবাজির অর্থ দিয়ে সংগঠনগুলো অবৈধ অস্ত্রের বিশাল মজুত গড়ে তুলছে। মূলত পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত বাঙালি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর এটি বাধ্যতামূলক ট্যাক্স হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁদা আদায়ের শীর্ষে রয়েছে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-সন্তু), যাদের বার্ষিক আদায়ের পরিমাণ প্রায় ২৮০ কোটি টাকা। এছাড়া ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসীত) ২৫০ কোটি টাকা এবং কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) ৭৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা চাঁদা তোলে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পাহাড়ে উৎপাদিত কলা, আদা, হলুদ, আনারস, আম কিংবা জুমের ফসল বাজারে বিক্রি করতে গেলে প্রতিটি ধাপে চাঁদা দিতে হয়। এমনকি বাড়ি-ঘর নির্মাণ, গবাদিপশু বেচাকেনা, নতুন ব্যবসা শুরু কিংবা সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন থেকেও এই জবরদস্তিমূলক চাঁদা কেটে নেওয়া হয়।

সশস্ত্র দলগুলোর চাঁদা আদায়ের প্রক্রিয়াকে ৬টি প্রধান সেক্টরের অধীনে ৪১টি উপখাতে ভাগ করা হয়েছে। সাধারণ খাতের মধ্যে রয়েছে বেসরকারি চাকরিজীবী, বেসরকারি পরিবার, পাহাড়ি পরিবার এবং গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও ভারতীয় গরু-মহিষ বিক্রির ওপর ধার্যকৃত ফি। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ১১টি খাতে চাঁদা নেওয়া হয়; যার মধ্যে রয়েছে বড়, মাঝারি ও ছোট দোকান, মোবাইল ফোন কোম্পানি, মোবাইল টাওয়ার, ছোট-বড় ইটভাটা, কল-কারখানা, মাছ ব্যবসায়ী সমিতি, আবাসন হোটেল, খাবার হোটেল, ভাসমান হোটেল, আসবাবপত্রের দোকান এবং কুরিয়ার কোম্পানি।

কৃষি, ফলদ ও বনজ বাগান সংক্রান্ত আরও ১১টি উপখাত থেকে টাকা তোলা হয়। এর মধ্যে বাগানের বার্ষিক চাঁদা, বস্তাপ্রতি হলুদ ও আদা, ছড়াপ্রতি কলা, ফলপ্রতি চাঁদা, বাগান মালিক, তামাক চাষি, তামাক চুল্লি, তামাক কোম্পানি, মৌসুমি ফল ব্যবসায়ী, জুমচাষি এবং উলু ফুল বা ঝাড়ু বিক্রির খাত অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া পরিবহন খাতের ৮টি ক্ষেত্র থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়, যা ট্রাক, পিকআপ, সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, বাস, বিভিন্ন কোম্পানির গাড়ি, চাঁদের গাড়ি এবং লঞ্চ, ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও স্পিডবোটে প্রযোজ্য। একই সঙ্গে প্রতিটি ঠিকাদারি কাজ, কাঠের সিএফটি ও পিস হিসেবে কাঠ ব্যবসায়ী এবং কাঠের জোত মালিকদের কাছ থেকেও নির্দিষ্ট হারে চাঁদা আদায় করা হয়।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তথ্যমতে, নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখা, বিপুল অর্থ সংগ্রহ এবং সাধারণ মানুষের মনে ভীতি সৃষ্টি করতে অপহরণকে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে এই সশস্ত্র গ্রুপগুলো। গত এক বছরে তারা সরকারি কর্মকর্তা ও সাধারণ নাগরিকসহ ১০৩ জনকে অপহরণ করেছে, যা পুরো পার্বত্য অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাঁদাবাজি ও মাদক বিক্রির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ সীমান্ত পার হয়ে মূলত ভারত ও মিয়ানমার থেকে অস্ত্র-গোলাবারুদ কেনায় ব্যবহার হচ্ছে।

প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট অস্ত্রের হিসাব তুলে ধরে বলা হয়, সম্প্রতি জেএসএস (সন্তু) ১৯টি অস্ত্র, ২ হাজার ৫৮০ রাউন্ড গোলাবারুদ ও ২০টি হ্যান্ড গ্রেনেড সংগ্রহ করেছে। অন্যদিকে ইউপিডিএফ (প্রসীত) সংগ্রহ করেছে ৬০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৮ হাজার ৮৫০ রাউন্ড অ্যামুনিশন এবং ১০টি হ্যান্ড গ্রেনেড। পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, অভিযানের সময় এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছ থেকে একে-৪৭, একে-৫৬, একে-২২, এম-১৬, মার্ক-২ রাইফেল, এম-৪ কার্বাইন, ৪০ এমএম গ্রেনেড লঞ্চার, চায়না rifle, ৯ এমএম পিস্তল, এসএলআর, এসএমজি, এলজি, জি-৩ রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, ভারী মেশিনগান এবং বিমানবিধ্বংসী রিমোট কন্ট্রোল বোমা ও গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি রকেট লঞ্চার, হাতবোমা, শক্তিশালী ওয়াকিটকি, মর্টার, ড্রোন ও সিগন্যাল জ্যামারের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিও তারা ব্যবহার করছে।

পাহাড়ের সার্বিক পরিস্থিতি ও চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে রাঙামাটি জেলা পুলিশ সুপার আব্দুর রকিব জানান, চাঁদাবাজির যেকোনো অভিযোগ পেলেই মামলা দায়ের করে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান নেওয়া সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের দমনে সেনাবাহিনী ও বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে তল্লাশি ও যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পার্বত্য বিষয়াবলি সম্পর্কিত নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রোকন উদ্দিন পরিস্থিতি মূল্যায়নে জানান, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তিটি তড়িঘড়ি করে করা হয়েছিল এবং এর কয়েকটি ধারা সংবিধানবিরোধী হওয়ায় তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। চুক্তির পর আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলো কিছু পুরোনো অস্ত্র জমা দিলেও মূল অস্ত্রের ভাণ্ডার রয়ে গেছে। উপরন্তু, দুই শতাধিক সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের ফলে তৈরি হওয়া প্রশাসনিক শূন্যতায় নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিবেশী ভারত এই পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের মদদ দিচ্ছে এবং দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে উচ্চপদস্থ কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কর্মকর্তাদের টার্গেট করছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০২১ সাল থেকে মিয়ানমার সীমান্তে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল থাকায় সেখানে গড়ে ওঠা খোলা অস্ত্রের বাজার থেকে সহজে রকেট লঞ্চার ও একে সিরিজের মতো অস্ত্র পার্বত্য অঞ্চলে পৌঁছাচ্ছে। এসব জটিল সমস্যা সমাধানে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির জরুরি পুনর্মূল্যায়ন এবং সব অংশীজনকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি শক্তিশালী কমিশন গঠনের পরমর্শ দেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৯: ১৮আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৯: ২০

নিরাপত্তা বাহিনীর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতি বছর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অবৈধ অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বড় অংকের চাঁদাবাজি করে। এই টাকা দিয়ে তারা অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেনে। সম্প্রতি জেএসএস সন্তুর একটি সশস্ত্র দল ১৯টি অস্ত্র, ২,৫৮০ রাউন্ড গোলাবারুদ ও ২০টি হ্যান্ড গ্রেনেড সংগ্রহ করেছে। এছাড়া ইউপিডিএফ (প্রসীত) ৬০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৮৮৫০ রাউন্ড অ্যামুনিশন ও ১০টি হ্যান্ড গ্রেনেড সংগ্রহ করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সশস্ত্র দলগুলো বিশেষত ভারত ও মিয়ানমার থেকে অস্ত্র গোলাবারুদ এবং মাদকদ্রব্য সংগ্রহ করে। সশস্ত্র সংগঠনগুলো মাদকদ্রব্য বিক্রির মাধ্যমে প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh