কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের শীর্ষে থাকা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ও বর্তমান কর্মীরা। তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তথ্য ও প্রযুক্তি সুরক্ষার ব্যবস্থা এতটাই শিথিল যে বহিরাগত কোনো পক্ষ বা বিদেশি সরকার খুব সহজেই তাদের গোপন প্রযুক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিতে পারে। কর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, সতর্কতা সত্ত্বেও শীর্ষ নেতৃত্ব নিরাপত্তার চেয়ে গুগল ও অ্যানথ্রোপিকের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের টেক্কা দিয়ে প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়নেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের শেষ ভাগে চ্যাটজিপিটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার আগেই বেশ কয়েকজন কর্মী নিরাপত্তা ঘাটতি নিয়ে ভেতরে অভ্যন্তরীণভাবে সরব হন। অন্তত পাঁচজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানান, তৎকালীন সময়ে পরিচালনা পর্ষদ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে এ বিষয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। তবে আলোচনার পরও কর্মীদের মনে হয়েছিল, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সুরক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ও তদারকির চেয়ে বাজারে প্রতিযোগিতা টিকে থাকা এবং উন্মোচনের গতি বাড়িয়ে দেওয়াকে প্রাধান্য দিচ্ছে।
ওপেনএআইয়ের অভ্যন্তরীণ তথ্য ব্যবস্থাপনার মূল দুর্বলতা ছিল প্রতিষ্ঠানের উচ্চমাত্রার প্রবেশাধিকার। কোড ব্যবহারের সুযোগ থাকা যেকোনো কর্মী নিজ দায়িত্বের বাইরের বিভিন্ন প্রকল্পের কারিগরি বিবরণ দেখতে পারতেন। ফলে বিদেশি সরকার বা অন্যান্য বহিরাগত চক্রের জন্য গোপনীয় তথ্য সংগ্রহের ঝুঁকি তৈরি হয়। এসব আশঙ্কার মধ্যেই সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা নীতিতে কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পণ্য উন্নয়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা থিবো সোতিয়ো অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা শক্তিশালী করার উদ্যোগের মূল দায়িত্বে এসেছেন। তিনি গত আগস্টে ওপেনএআইয়ের উৎপাদন প্রকৌশলীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশকে নিরাপত্তা অবকাঠামো বিনির্মাণের কাজে নিয়োজিত করেন।
চ্যাটজিপিটি চালুর পর এআই প্রযুক্তি এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। ফলে চীন বা অন্যান্য বিদেশি প্রতিপক্ষের হাত থেকে এসব প্রযুক্তি সুরক্ষিত রাখার চাপ যেমন রয়েছে, তেমনি সুরক্ষার কঠোর কড়াকড়ি প্রযুক্তির অগ্রগতির গতি কমিয়ে দিতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের মতো উদীয়মান এআই জায়ান্টগুলোর শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির সম্ভাব্য পরিকল্পনাকেও জটিল করে তুলতে পারে এই দ্বন্দ্ব। চলতি বছরের এপ্রিলে প্রতিষ্ঠান ছাড়া ওপেনএআইয়ের সাবেক গবেষক উইল ডিপু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, এআই খাতের প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র হওয়ায় কোনো নেতাই সুরক্ষার স্বার্থে প্রযুক্তির বিকাশ শ্লথ করতে চান না। এমনকি জাতীয় নিরাপত্তার মতো বড় হুমকি মোকাবিলা করার চেয়েও দ্রুত এগিয়ে যাওয়াকে তাদের কাছে বেশি প্রাধান্য পেতে দেখা যায়।
নিরাপত্তা তদারকির চরম ঘাটতি প্রকাশ্যে আসে গত অক্টোবরে, যখন এক নির্বাহী কর্মকর্তার কনফারেন্স রুমে গোপনে অডিও আড়িপাতার যন্ত্র উদ্ধারের খবর মেলে। গত ১৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানায়, ৩৫ বছর বয়সী সৌদি নাগরিক ও ওপেনএআইয়ের তৎকালীন প্রকৌশলী আবদুলরহমান আলফোজানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে টিস্যু পেপারের ভেতর অডিও রেকর্ডিং ডিভাইস লুকিয়ে কনফারেন্স রুমে বসানোর অভিযোগ আনে দেশটির ফেডারেল এজেন্টরা। আদালতের নথি থেকে জানা যায়, আলফোজান ওপেনএআইয়ের নিজস্ব এআই টুল ব্যবহার করে সৌদি আরব সফরকারী নির্বাহীদের তথ্য ও সৌদির মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের বিবরণ অনুসন্ধান করেছিলেন। এ ছাড়া সৌদি আরবে নতুন একটি এআই উদ্যোগ চালু করতে চাওয়া এক রাজপরিবারের সদস্যের সঙ্গেও তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, যিনি তাকে নতুন প্রকল্পে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। অবশ্য এ নিয়ে আলফোজানের আইনজীবীরা কোনো মন্তব্য করেননি।
ওপেনএআইয়ের মূল কোড ও গবেষণা নথির সহজলভ্যতা নিরাপত্তা উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বেশিরভাগ কোড ‘মনোরেপো’ নামের এক কেন্দ্রীয় ভান্ডারে রাখা হতো। এর জটিল গঠনের কারণে পূর্বে বহিরাগতদের তথ্য খোঁজা কঠিন হলেও, আধুনিক এআই প্রযুক্তির এজেন্টের মাধ্যমে তা মুহূর্তেই বিশ্লেষণ করা সম্ভব। এ ছাড়া গবেষকদের নথি গিটহাব ও স্ল্যাকের মতো উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মে রাখার ফলেও তথ্য চুরির ভয় দেখা দেয়। তবে ওপেনএআইয়ের দাবি, অতি সংবেদনশীল কাজের বড় অংশই পৃথক ভান্ডারে কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় এবং ‘মডেল ওয়েটস’ বা মডেল পরিচালনার গাণিতিক মানদণ্ড মনোরেপোতে সংরক্ষিত থাকে না।
অন্য একটি বড় সমস্যা ছিল স্যান্ডবক্স বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার টুলগুলোর অনিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা। গবেষকেরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী এসব অভ্যন্তরীণ টুল পরিবর্তন করলেও নিয়মিত সুরক্ষা যাচাই করা হতো না। তিনজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তথ্যানুযায়ী, এতে সাইবার হামলার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছিল। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রধান তথ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা (সিআইএসও) হিসেবে যোগ দেওয়া ডেন স্টাকি সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিচালনা করছেন এবং অভ্যন্তরীণ টুলগুলোর নিয়মিত নিরাপত্তা যাচাই নিশ্চিত করা হচ্ছে।
তবে শুধু ওপেনএআই নয়, পুরো এআই সেক্টরই সাইবার হুমকির মুখে পড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সান ফ্রান্সিসকোর এক বিচারক গুগলের সাবেক কর্মীকে চীনের হয়ে হাজার হাজার পৃষ্ঠার গোপন এআই প্রযুক্তি চুরির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন, যাকে ২০২৪ সালের মার্চে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অন্যদিকে অক্টোবর মাসের শেষ দিকে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যাথেড্রাল সিস্টেমস দাবি করে, তারা অ্যানথ্রোপিকের স্ল্যাক চ্যানেলে প্রবেশ করে সংবেদনশীল তথ্য দেখতে পেরেছে। পরে অ্যানথ্রোপিক স্বীকার করে যে হামলাকারীরা কিছু গ্রাহক, অংশীদার এবং সাধারণ অ্যাকাউন্টের নথিতে প্রবেশাধিকার পেয়েছিল।
ঐতিহাসিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উন্মুক্ত জ্ঞানচর্চা থেকে এআই খাতের সূচনা হয়েছিল। সেই সংস্কৃতি ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলো উন্মুক্ত পরিবেশ রাখলেও প্রযুক্তি শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকি বাড়ছে। ২০২৩ সালে ওপেনএআইয়ের গবেষক লিওপোল্ড আশেনব্রেনার ‘ওপেনএআই ইজ চায়নাস লিডিং এআই ল্যাব’ শীর্ষক এক অভ্যন্তরীণ স্মারক তৈরি করে চীনে তথ্য পাচারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে বহিরাগত এক ব্যক্তি জিপিটি-৪ মডেলের তথ্য হাতিয়ে নিলে তিনি পরিচালনা পর্ষদকে স্মারকলিপিটি দেন। তবে ওপেনএআইয়ের দাবি, ওই হ্যাকার কেবল কর্মীদের সাধারণ স্ল্যাক চ্যানেলেই পৌঁছাতে পেরেছিল।
নিরাপত্তা সম্পর্কিত আরও কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে ঘটেছে। চলতি বছরের গ্রীষ্মে ওপেনএআইয়ের একটি পরীক্ষাধীন এআই এজেন্ট ‘হাগিং ফেস’ নামক অন্য প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে হ্যাকিং চালালে হোয়াইট হাউসসহ সরকারি পর্যায়ে শঙ্কা তৈরি হয়। আবার গত জুলাইয়ে ‘হ্যাকট্রন এআই’ নামের সাইবার সংস্থা দাবি করে, তাদের তিনজন গবেষক প্রতিযোগী এআই মডেলের মাধ্যমে ওপেনএআই কর্মীদের চ্যাটজিপিটি অ্যাকাউন্টে ঢোকে এবং মনোরেপো সহ অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।
সার্বিক বিষয়ে ওপেনএআইয়ের মুখপাত্র এলানা উইডম্যান জানান, ওপেনএআই বিশ্বজুড়ে অন্যতম প্রধান সাইবার হামলার লক্ষ্যবস্তু। ফলে প্রযুক্তি, তথ্য ও কর্মীদের সুরক্ষায় তারা বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করছেন। তিনি বলেন, বিষয়টিকে তারা জাতীয় গুরুত্বের একটি মূল দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন। সাম্প্রতিক সময়ের দ্রুত পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে যে তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা ঝুঁকির দ্রুত শনাক্তকরণ ও সমাধান করতে সক্ষম। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের যোগাযোগের পর গত সোমবারে দেওয়া এক ব্লগ পোস্টে ওপেনএআই নিশ্চিত করেছে, সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় তারা শিগগিরই একটি নতুন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে।





