মস্কোয় পুতিনের হাতে খামেনির বার্তা পৌঁছে দিলেন ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান

Published: November 6, 2026, 12:59 pm

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে মস্কোয় এক গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজায়ি। বৃহস্পতিবার মস্কোর সিনেট প্যালেসে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির একটি বিশেষ চিঠি রুশ প্রেসিডেন্টের হাতে তুলে দেন। বৈঠকে দুই নেতা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ইরান কেন্দ্রিক মার্কিন ও ইসরায়েলি সংঘাত বন্ধের কূটনৈতিক উপায় এবং যুদ্ধোত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

বৈঠক শেষে মোহসেন রেজায়ি জানান, খামেনি তাঁকে যত দ্রুত সম্ভব বার্তাটি পুতিনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। প্রায় এক মাস আগেই এই মস্কো সফরের সময়সূচি নির্ধারিত থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে দৈনন্দিন আলোচনার কারণে তা কিছুটা পিছিয়ে যায়। চিঠির সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু প্রকাশ্যে না আনলেও রেজায়ি উল্লেখ করেন, পুতিনের সঙ্গে জ্বালানি খাতসহ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে ফলপ্রসূ কথা হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে ইরানে প্রস্তাবিত একটি গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা গুরুত্ব পায়, যা ইরানের অভ্যন্তরীণ গ্যাসসংকট কাটানোর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশে রাশিয়ার গ্যাস রপ্তানির পথ সহজ করবে।

এই বৈঠকের ঠিক আগের দিন এক লিখিত বিবৃতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি স্পষ্ট জানান, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতিস্বীকার বা আত্মসমর্পণের সামান্য মনোভাবও তেহরানের থাকা উচিত নয়। শত্রুপক্ষের হুমকি মোকাবেলায় চূড়ান্ত প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে ইরানকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি। এদিকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে তেহরান নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইতঃপূর্বে কুয়েত, সৌদি আরব, ওমান, কাতার, তুরস্ক ও জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন।

কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যে কাতার যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতা জোরদার করলেও মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে সংঘাত বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত মঙ্গলবারের নির্বাচনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। যুদ্ধজনিত কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ব্যাপক জনঅসন্তোষ তৈরি হয়। এই রাজনৈতিক চাপের মুখে যুদ্ধবিরতির আলোচনা ঘিরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ, ইরানের সমুদ্রবন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় শুরুর বিষয়গুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।

কূটনৈতিক শর্তের বিষয়ে কড়া অবস্থান ব্যক্ত করে রেজায়ি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তারা সাতটি সুনির্দিষ্ট শর্ত দিয়েছেন। ওয়াশিংটন এসব শর্ত মেনে না নেওয়া পর্যন্ত ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে না এবং কোনো ধরনের আলোচনায় বসবে না। তবে পুতিন ইরানকে আশ্বস্ত করেছেন যে যুদ্ধ বন্ধে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে রাশিয়া সব ধরনের সহায়তা দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত। এর আগে গত মাসে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকেও একই অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট।

আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও তেহরান ও মস্কো একযোগে কাজ করার ইঙ্গিত দিয়েছে। অক্টোবর মাসের শেষ দিকে তেহরানে অনুষ্ঠিত ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের চারপক্ষীয় বৈঠকের বিষয়ে পুতিনকে অবহিত করেন রেজায়ি, যা রুশ প্রেসিডেন্ট সানন্দে স্বাগত জানান। রেজায়ি জোর দিয়ে বলেন, বহিরাগত কোনো দেশের হস্তক্ষেপ ছাড়াই আঞ্চলিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা চীনা বন্ধুদের সঙ্গে একমত হয়েছেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস সিনেট প্যালেসে বৈঠকের তথ্য নিশ্চিত করলেও ক্রেমলিন থেকে তাৎক্ষণিকভাবে পৃথক কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ইরান ও রাশিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশ একটি সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা ওই বছরের অক্টোবরে কার্যকর হয়। বাণিজ্য, সামরিক সহযোগিতা, বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে এ চুক্তি ভূমিকা রাখলেও এতে কোনো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা রাখা হয়নি। তবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অংশ হিসেবে ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া সম্প্রতি জানান, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই রাশিয়ার কাছ থেকে কেনা অত্যাধুনিক এসইউ-৩৫ (Su-35) যুদ্ধবিমানগুলোর সরবরাহ পাবে তেহরান।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo