শেখ হাসিনাকে আশ্রয় প্রদান এবং রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ করে দেওয়া বাংলাদেশের জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তুলতে হলে ভারতকে এ দেশের মানুষের প্রকৃত আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুধাবন করতে হবে এবং নতুন বাংলাদেশের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত হতে আরও স্পষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে আসাঙ্গা আবেয়াগোনাসেকারার লেখা নতুন বই ‘উইন্ডস অব চেঞ্জ: জিওপলিটিক্স অ্যাট দ্য ক্রসরোডস অব সাউথ অ্যান্ড সাউথইস্ট এশিয়া’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য ছিল পরাশক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যুক্তরাষ্ট্র-চীন ও চীন-ভারত ভূরাজনীতি এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি।
গ্লোবাল ফোরসাইট স্ট্র্যাটেজিসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী প্যাটি মরিসের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন দ্য মিলেনিয়াম প্রজেক্টের নির্বাহী পরিচালক, সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জেরোম সি. গ্লেন এবং আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান। এতে বইটির লেখক আসাঙ্গা আবেয়াগোনাসেকারাসহ কূটনীতিক, সাংবাদিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন রবার্ট এফ. কেনেডির কন্যা ক্যাথলিন কেনেডি এবং ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের মার্ক শোয়েফ জুনিয়র।
আলোচনায় মুশফিকুল ফজল আনসারী জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ও অন্যান্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জনগণের প্রত্যাশা বুঝতে ভারতকে আরও বেশি উদ্যোগী হতে হবে। একটি টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব কখনো কেবল একজন নির্দিষ্ট নেতা বা কোনো একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, তা গড়ে তুলতে হয় সে দেশের জনগণের সঙ্গে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের স্বাধীনতা, সম্মান ও একটি জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার আকুল আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই জনআকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব পরিবর্তনের রূপ দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ চায় রাষ্ট্র পরিচালনায় যেন তাদের নিজস্ব কণ্ঠস্বরের সঠিক প্রতিফলন ঘটে।
তিনি বাংলাদেশের প্রতি চীনের সহযোগিতামূলক মনোভাবের প্রশংসা করে বলেন, দেশের উন্নয়ন ও নতুন সুযোগ তৈরিতে এ অংশীদারত্বকে ব্যবহার করা উচিত। ওয়াশিংটনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লালগালিচা সংবর্ধনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, চরম প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোও এখন পারস্পরিক আলোচনা ও সহযোগিতার গুরুত্ব দিচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন।
ভারত ও চীন উভয় দেশের সঙ্গেই বন্ধুত্ব জোরদারের পক্ষে মতামত দিয়ে রাষ্ট্রদূত আনসারী বলেন, এই সম্পর্ক হতে হবে সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি মর্যাদার ওপর প্রতিষ্ঠিত। নিজ দেশের জনগণের স্বার্থে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা বাংলাদেশের থাকা উচিত।
অনুষ্ঠানে ভৌগোলিক রাজনীতির নানাদিক বিশ্লেষণ করে মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ক্ষমতার লড়াই এখন আর শুধু চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; রাশিয়াও এখানে নিজস্ব প্রভাব বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার শক্তিশালী জ্বালানি সম্পর্ক এবং পাকিস্তান ও নেপালের বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে তাদের উপস্থিতি তুলে ধরেন তিনি। তিনি জানান, দক্ষিণ এশিয়ায় মস্কোর সরাসরি কোনো শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র নেই এবং ভারতের বাইরেও এ অঞ্চলে রাশিয়ার সুসম্পর্ক রয়েছে।
নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা বা নেপালের মতো দেশগুলোর চীনঘেঁষা হওয়া বা ভারত থেকে দূরে সরে যাওয়ার ধারণাকে সরলীকরণ হিসেবে আখ্যা দেন কুগেলম্যান। তাঁর মতে, এসব দেশ কোনো নির্দিষ্ট শিবিরে যোগ দেওয়ার বদলে দুই পরাশক্তির সঙ্গেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার পথ খুঁজছে। এছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনের পর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন বিশ্বব্যবস্থাসহ এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে 'জিরো-সাম' বা এক পক্ষের জয় মানেই অন্য পক্ষের পরাজয়—এমন ধারণার তীব্র সমালোচনা করেন জেরোম সি. গ্লেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতি ও ব্যবসা সংক্রান্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি এই মানসিকতা শেখাতে থাকে, তবে বিশ্ব এ প্রতিযোগিতার বৃত্ত থেকে বের হতে পারবে না। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ও ক্ষুদ্রায়নের ফলে ভবিষ্যতে একক কোনো ব্যক্তি কর্তৃক গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির ঝুঁকির বিষয়েও তিনি সতর্ক করেন এবং বাকমিনস্টার ফুলারের 'সイナー্জি' বা সম্মিলিত সুফল তৈরির ধারণার ওপর ভিত্তি করে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠান শেষে লেখক আসাঙ্গা আবেয়াগোনাসেকারা তাঁর ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে বলেন, পরাশক্তির প্রতিযোগিতা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও কৌশলগত স্বাধীনতার প্রচেষ্টা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে একসূত্রে গেঁথে ফেলছে। প্রতিবেশীদের প্রতি ভারতের তৈরি হওয়া আস্থার ঘাটতির বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শুধু স্মারক চুক্তি বা প্রতিরক্ষা চুক্তির রাজনৈতিক রূপ দেখলেই চলবে না, এর বাস্তব ফল ও সমঅধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতা, ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের প্রভাব, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও ভারত মহাসাগরের সামরিকীকরণকে ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি ছোট রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীন নীতি নির্ধারণের অধিকার রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন।





