মৌলভীবাজারের পশ্চিম বাজার: গ্রামীণ হাট থেকে আধুনিক অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র

Published: September 17, 2026, 9:16 am

মৌলভীবাজার শহরের প্রবেশপথে মনু নদের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা পশ্চিম বাজার বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্নায়ুকেন্দ্র। প্রায় ছয় হাজার স্থায়ী ও অস্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে বিস্তৃত এই বাণিজ্যিক এলাকাটি আজ আধুনিক রূপ পেলেও এর শিকড় প্রোথিত শত বছর আগের গ্রামীণ ইজারা প্রথা ও নদকেন্দ্রিক বাণিজ্যে। স্থানীয় ইতিহাস ও ব্যবসায়ী সৈয়দ আবদুল মতালিব রঞ্জুর তথ্যমতে, ১৮১০ সালে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গী হজরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা (রহ.)-এর বংশধর জমিদার মৌলভী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ মনু নদের পশ্চিম তীরে এই বাজারটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৯৩ সালে মুন্সেফ বা বিচারক হিসেবে নিযুক্ত এই জমিদারের নামানুসারেই জনপদটি মৌলভীবাজার নামে পরিচিতি পায়।

শুরুর দিকে পশ্চিম বাজারে সোম ও বৃহস্পতিবার হাট বসত, যেখানে স্থানীয় কৃষকেরা ধান, চাল, তেল, সবজি, হাওরের মাছ ও শুঁটকি নিয়ে আসতেন। তখনকার আয়ের প্রধান উৎস ছিল জমিদারের আদায় করা ‘তুলা’ বা খাজনা। সড়কপথের উন্নয়নের আগে মনু ও কুশিয়ারা নদই ছিল বাণিজ্যের প্রাণ। মনুমুখ লঞ্চঘাটকে কেন্দ্র করে তখন পাট ও কাঠের ব্যাপক ব্যবসা চলত, যা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলসহ ভৈরব ও নারায়ণগঞ্জের মতো বড় বাণিজ্যিক হাবের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছিল। তবে ১৯৮৯ সালে সংরক্ষিত বনে গাছ কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেই নৌ-বাণিজ্য ও পাটের ব্যবসা এখন বিলুপ্তপ্রায়।

কালের বিবর্তনে পশ্চিম বাজার আজ এক রেমিট্যান্স-নির্ভর আধুনিক বাজারে রূপান্তরিত হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী রিপন সরদারের মতে, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থই এখন এই বাজারের মূল চালিকাশক্তি। ইউরোপ-আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রবাসীরা ছুটিতে দেশে ফিরলে বাজারের কেনাকাটা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই চাহিদা ও রুচির কথা মাথায় রেখে দোকানগুলোতে আধুনিক ইন্টেরিয়র ও বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্যের সমাহার দেখা যায়। এক্সিম ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংকসহ প্রায় প্রতিটি ব্যাংকের শাখা ও এক্সচেঞ্জ হাউস এখানে গড়ে উঠেছে, যা দৈনিক কোটি কোটি টাকার লেনদেন সহজতর করছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, এই বাজারের বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সহাবস্থান থাকা সত্ত্বেও বাজারটিতে রয়ে গেছে কিছু সংকট। সরু রাস্তা ও অপরিকল্পিত নির্মাণের কারণে যানজট নিত্যদিনের সঙ্গী, যা মালবাহী ট্রাক চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়া বিসিক শিল্প এলাকার কারখানাগুলোর করুণ দশা, কাঁচামালের অভাব এবং দক্ষ কারিগরের সংকটে বেতশিল্প ও কাঠের বাদ্যযন্ত্রের মতো কুটিরশিল্পগুলো হুমকির মুখে। বর্তমানে স্থানীয় কৃষিপণ্যের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারটি অনেকটা বাইরের জেলার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। মাছের বাজারের ক্ষেত্রেও প্রাকৃতিক মাছের বদলে এখন ৯০-৯৫ শতাংশই আসে বাণিজ্যিক খামার থেকে। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে পশ্চিম বাজার বৃহত্তর সিলেটের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo