জ্বালানি সংকটে কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ হয়নি: বিজিএমইএ

Published: September 17, 2026, 9:03 am

দেশে সাম্প্রতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে এখন পর্যন্ত কোনো তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)। তবে এই সংকটের প্রকৃত প্রভাব কতটুকু, তা বুঝতে আরও অন্তত তিন মাস সময় লাগবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান সংগঠনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। ‘বাটেক্সপো ২০২৬’, হংকং রোডশো এবং পোশাক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, পোশাকশিল্পে যেকোনো সংকটের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয়না। একটি কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত একদিনে নেওয়া সম্ভব নয়। পাইপলাইনের অর্ডার সম্পন্ন করা, শ্রমিকদের আইনগত ক্ষতিপূরণ ও ব্যাংকের দায়-দেনা পরিশোধসহ নানা বিষয় বিবেচনা করে কারখানা বন্ধ করতে প্রায় ছয় মাসের একটি দীর্ঘ পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়। তাই গত দুই মাসে জ্বালানি সংকটের কারণে কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি। এমনকি ছয় মাস বা এক বছর আগের কোনো ঘটনার কারণে এখন কোনো কারখানা বন্ধ হলে, সেটিকে বর্তমান সংকটের ওপর চাপানো ঠিক হবে না।

গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির বিষয়ে তিনি জানান, অতি সম্প্রতি পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে এবং গত কয়েক দিনের তুলনায় সরবরাহ বেড়েছে। এর আগে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ডাইং ও ওয়াশিংসহ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। তবে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়ী নেতাদের বৈঠকের পর শিল্পে গ্যাস সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা কার্যকর করা হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে কারখানাগুলো ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা চললেও, সংকটের কারণে উদ্যোক্তাদের অতিরিক্ত প্রায় ৫ ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়েছে এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তা সত্ত্বেও উদ্যোক্তারা সময়মতো পণ্য পাঠানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিএমইএ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কাছে পেশ করেছে, যা বাস্তবায়ন হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে সংকটের বড় সমাধান সম্ভব। এছাড়া দুটি অতিরিক্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপন এবং দীর্ঘমেয়াদে ল্যান্ড-বেইজড স্টোরেজ টার্মিনাল নির্মাণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। চীনের সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে একটি এফএসআরইউ আনার চুক্তি হলেও, বিজিএমইএ মনে করে শুধু এফএসআরইউ বাড়ালেই হবে না, গ্যাস বিতরণ লাইনের উন্নয়নও সমান্তরালে করতে হবে। পাশাপাশি এসএমই কারখানায় গ্যাস রেশনিং ও সংযোগে অগ্রাধিকার, ১০০ থেকে ৫০০ পিএসআই বয়লারসম্পন্ন কারখানায় সংযোগ এবং উপকূলীয় এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের দাবি জানানো হয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়ে সভাপতি জানান, তিনি নিজে ২০১৯ সাল থেকে তার প্রতিষ্ঠানে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন, যার ক্ষমতা প্রায় ১৪ মেগাওয়াট। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি রিটার্ন ও উচ্চ সুদের হারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কম সুদের 'গ্রিন ফাইন্যান্স' বা সবুজ ঋণ নিয়ে আলোচনা চলছে।

এলডিসি উত্তরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পেছানোর সরকারি উদ্যোগ ব্যবসায়ীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এটি পাস হলে প্রস্তুতির বাড়তি সুযোগ মিলবে। এলডিসি পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে জিএসপি প্লাস নয়, বরং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করা সবচেয়ে জরুরি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে অনেক দূর এগিয়েছে। ব্যবসা সহজ করতে কোম্পানি ও কাস্টমস আইন আধুনিকায়ন এবং রপ্তানি খাতে অন্তত ৫ বছরের জন্য নীতিগত সহায়তা ও শুল্ক-কর কাঠামোর ধারাবাহিকতা চেয়েছে বিজিএমইএ।

নতুন বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়ে জানানো হয়, বর্তমানে মোট ৪০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির মধ্যে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার আসে অপ্রচলিত বাজার থেকে। জাপানি ক্রেতাদের সুবিধার্থে বিজিএমইএ একটি ‘জাপান ডেস্ক’ চালু করতে যাচ্ছে, যেখানে জাপানি ভাষায় দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে জাপানে রপ্তানি বর্তমানের ৫০০ মিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ২ থেকে আড়াই বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারে শুধু কম দামি পণ্য উৎপাদনকারী হিসেবে নয়, বরং একটি আধুনিক ও উদ্ভাবননির্ভর শিল্প হিসেবে তুলে ধরতে বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের সঙ্গে একটি কৌশলগত চুক্তি করা হয়েছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Alokito Bangladesh