‘ঢাকায় থাকতে আমার ভালো লাগে না। বান্ধবীর কাছ থেকে পাওনা টাকা এনে পরদিন ময়মনসিংহে নানির বাড়ি চলে যাব।’ গত ১৫ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার সময় মা মোসা. নাজমাকে কথাগুলো বলেছিল ১১ বছর বয়সী মুক্তা আক্তার। তবে সেই যে সে ঘর থেকে বেরিয়েছিল, আর ফেরেনি। স্বজনেরা সারা রাত পরিচিতদের কাছে খোঁজ নিয়েও তার কোনো সন্ধান পাননি। একদিন পর শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে পরিবার জানতে পারে, আহত অবস্থায় মুক্তা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। খবর পেয়েই স্বজনেরা হাসপাতালে ছুটে যান।
হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে খুঁজে না পেয়ে শেষে মর্গে গিয়ে মুক্তার ছবি দেখান মুক্তার মা ও মামারা। ছবি দেখে মর্গ ইনচার্জ মো. জীবন হাসান নিশ্চিত করেন যে শিশুটির মরদেহ সেখানেই ছিল। তবে স্বজনদের আশার আলো নিমেষেই নিভে যায়, যখন জানতে পারেন ওই দিনই তার মরদেহ দাফনের জন্য আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরে আঞ্জুমান মুফিদুলে যোগাযোগ করে পরিবার জানতে পারে, এরই মধ্যে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে তাকে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। শেষবারের মতো নিজের সন্তানের মুখটি দেখার সুযোগটুকুও না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন মা নাজমা।
পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৫ অক্টোবর শুক্রবার ভোরে শ্যামলী বাসস্ট্যান্ডের কাছে একটি ট্রাকের চাপায় গুরুতর আহত হয়েছিল মুক্তা। পথচারীরা উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে নিয়ম অনুযায়ী বেওয়ারিশ মরদেহ মর্গে সাত দিন সংরক্ষণ করার কথা থাকলেও কেন একদিনের মধ্যে দাফন করা হলো, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহত শিশুর মা। তাঁর প্রশ্ন, ‘আমার সন্তানের মুখটা তারা শেষবারের মতোও দেখতে দিল না। আমি তো জানতামই না, আমার মেয়েকে এভাবে দাফন করে দেওয়া হবে। অন্তত একবার মেয়ের মুখটা দেখতে পারতাম!’ এই তড়িঘড়ি দাফনের জবাব hospital কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি করেছেন তিনি।
মর্গে মরদেহ রাখা ও হস্তান্তরের বিষয নিয়ে জানতে চাইলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গের ইনচার্জ মো. জীবন হাসান জানান, ফ্রিজ নষ্ট থাকায় মরদেহ সেখানে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না, রাখলে পচে যেত। কোনো ওয়ারিশ দাবি না করায় তা দাফনের জন্য দেওয়া হয়। অন্যদিকে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের প্রতিনিধি মো. কামরুল হাসান বলেন, অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবেই মুক্তাকে দাফন করা হয়েছিল। দাফন শেষ হওয়ার পর পরিবার যোগাযোগ করলে তাদের কবরের ছবি দেখানো হয়।
এদিকে দুর্ঘটনার পেছনে দায়ী ট্রাকটি এখনো শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ, যা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে স্বজনদের। মা নাজমার অভিযোগ, বারবার আকুতি জানানো সত্ত্বেও পুলিশ তাদের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখায়নি। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ট্রাকটি উদ্ধার করতে এত বিলম্ব হওয়ার কথা নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তা ছাড়া পুলিশের দেওয়া তথ্যেও অসঙ্গতি দেখছেন এই মা। পুলিশ জানিয়েছে ট্রাকটি মুক্তার পায়ের ওপর দিয়ে গেছে, কিন্তু থানায় মুক্তার যে ছবি তিনি দেখেছেন, তাতে শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন তিনি পাননি। সেই ছবিটির জন্য পুলিশের পায়ে ধরলেও তারা তা হস্তান্তর করেনি বলে অভিযোগ তাঁর।
এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল হালিম গত শনিবার জানান, সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে ট্রাকটি শনাক্ত করার কাজ চলছে। তবে চালক আটক বা ট্রাক শনাক্তের সর্বশেষ অগ্রগতি জানতে পরবর্তী সময়ে সোমবার ও মঙ্গলবার একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
নিহত মুক্তা দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত এবং পরিবারসহ মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান আবাসিক এলাকায় থাকত। চঞ্চল স্বভাবের ফুটফুটে মেয়েটিকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন ছিল মায়ের। বড় হয়ে শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। মুক্তার বাবা মো. রাজীব আক্ষেপ করে বলেন, ‘কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেয়েটার কীভাবে কী হয়ে গেল, কিছুই বুঝতে পারলাম না। মেয়ের স্মৃতি কোনোভাবেই ভুলতে পারছি না।’ শেষবারের মতো মেয়ের মুখটি না দেখতে পাওয়ার বেদনায় বাকরুদ্ধ পুরো পরিবার।





