একই সুরে বিদায় নিলেন মেসি, রোনালদো ও নেইমার

Published: November 7, 2026, 9:36 am

ফুটবল মাঠে তারা ছিলেন তিনটি আলাদা গল্পের নাম। একজনের পায়ে ছিল জাদু, অন্যজনের পায়ে অবিশ্বাস্য ক্ষুধা, আর অন্যজনের পায়ে ছিল শৈল্পিক সৌন্দর্য। লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও নেইমার জুনিয়র—এই তিন মহাতারকা মিলে বদলে দিয়েছিলেন আধুনিক ফুটবলের সংজ্ঞা। কখনো প্রতিপক্ষের রক্ষণকে তছনছ করেছেন, কখনো ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে লিখেছেন নতুন ইতিহাস, আবার কখনো কোটি মানুষের রাত জাগার কারণ হয়েছেন। তাদের ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে ফুটবলের এক দীর্ঘ সময়।

তবে সময়ের নির্মম নিয়মে এখন তাদের বিদায়ের সুর বেজেছে। পাঁচ মাসের ব্যবধানে তিন মহাতারকার আন্তর্জাতিক ফুটবলে বিদায়ের ঘোষণা যেন একটি যুগের পরিসমাপ্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। নেইমার, মেসি ও রোনালদো—তিনজনের পথচলা আলাদা হলেও তাদের বিদায়ের গল্পে মিলে গেছে অদ্ভুত এক সমীকরণ। মজার বিষয় হলো, জাতীয় দলের হয়ে শেষ গোলটি করেছেন তিনজনই পেনাল্টি থেকে।

শুরুটা ছিল নেইমারকে দিয়ে। ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে যার পায়ের কারুকাজে মুগ্ধ হয়েছে পুরো বিশ্ব, সেই নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টাও ছিল আবেগে মোড়ানো। বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করেছিলেন তিনি, যদিও শেষ পর্যন্ত দলকে পরাজয় থেকে বাঁচাতে পারেননি। ২৮ জুলাই জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার ঘোষণা দেন এই ব্রাজিলিয়ান তারকা। ব্রাজিলের হয়ে তার পথচলা থেমে গেলেও ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে তার শৈল্পিক ফুটবল থেকে যায় অমলিন।

এরপর বিদায়ের তালিকায় নাম লেখান লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপের আরেকটি ফাইনালে শিরোপা জিততে না পারার আক্ষেপ নিয়ে ৩১ আগস্ট জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার ঘোষণা দেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। তবে দেশের মাটিতে বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে অ্যাসিস্টের পাশাপাশি পেনাল্টি থেকে গোল করে তিনি তার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন। যেন দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ দৃশ্যটুকুও নিজের মতো করে সাজিয়ে নিলেন আটবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী এই ফুটবল জাদুকর।

সবশেষে ৫ নভেম্বর জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার ঘোষণা দিয়ে নিজের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি টানেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। পর্তুগালের হয়ে তার শেষ গোলটিও এসেছিল নেশন্স লিগে পেনাল্টি থেকেই। গোলের পর গোল করে যিনি জাতীয় দলকে বহুবার আনন্দে ভাসিয়েছেন, তার আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের শেষ গোলটিও যেন একই সুরে বাঁধা। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, এখন থেকে মনোযোগ থাকবে কেবল ক্লাব ফুটবলে।

এই তিন তারকার অবদানকে কেবল গোল কিংবা শিরোপার পরিসংখ্যানে আটকে রাখা অন্যায় হবে। নেইমার ফুটবলকে উপহার দিয়েছেন নান্দনিকতা, ড্রিবলিং আর সৃজনশীলতার অনন্য প্রদর্শনী। মেসি যেন ফুটবলের এক জীবন্ত শিল্পী; বল পায়ে তার গতির পরিবর্তন, নিখুঁত পাস আর প্রতিপক্ষকে বোকা বানানোর ক্ষমতা তাকে কিংবদন্তির উচ্চতায় নিয়ে গেছে। অন্যদিকে রোনালদো পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ও অদম্য উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি। প্রতিকূলতাকে জয় করে নিজেকে বারবার নতুন করে গড়ার যে গল্প তিনি লিখেছেন, তা ফুটবলের বাইরেও কোটি মানুষের প্রেরণা। পর্তুগালকে ইউরো ও নেশন্স লিগ জেতানোর পথেও তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

এক সময় ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনার বড় অংশজুড়ে থাকতেন এই তিনজন। সময়ের পরিক্রমায় এখন আর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই নেই, বরং তাদের রেখে যাওয়া স্মৃতি উদ্‌যাপনের সময় এসেছে। তাদের বিদায়ে ফুটবলের আকাশে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা হয়তো নতুন তারকারা পূরণ করবেন। কিন্তু একই সময়ে তিনজনের এমন প্রভাব ও দীর্ঘস্থায়ী আধিপত্যের পুনরাবৃত্তি সহজ হবে না। কারণ, তারা শুধু নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেননি; তারা একটি প্রজন্মের ফুটবলীয় আবেগ, ভালোবাসা ও স্মৃতির নাম হয়ে উঠেছিলেন। তাদের জাতীয় দলের বিদায় তাই কেবল তিন ফুটবলারের অবসর নয়, ফুটবলের এক স্বর্ণালি অধ্যায়ের পর্দা নামার প্রতিধ্বনি।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Alokito Bangladesh