৩৫ বছরের পর আইনজীবী হওয়া বন্ধে নেওয়া হচ্ছে উদ্যোগ: আইনমন্ত্রী

Published: October 13, 2026, 11:22 am

৩৫ বছর বয়সের পর যাতে কেউ নতুন করে আইনজীবী হতে না পারেন, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, এ বিষয়ে ইতিমধ্যেই নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্ট অডিটোরিয়ামে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে এই সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের বিষয়টি প্রথম উঠে আসে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের লিগ্যাল এডুকেশন কমিটির সুপারিশে। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ২৫৩/২০১৪ নম্বর সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিলের শুনানির আলোকেই কমিটি বয়সসীমা নির্ধারণের যৌক্তিকতা তুলে ধরে। পরবর্তীতে গত ১৯ আগস্ট বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় লিগ্যাল এডুকেশন কমিটির এই প্রস্তাব উপস্থাপন করা হলে সদস্যরা ৩৫ বছর বয়সসীমা নির্ধারণে একমত প্রকাশ করেন। নতুন এই নিয়ম আগামী ২০৩০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে। লিগ্যাল এডুকেশন কমিটি উল্লেখ করে, আইন পেশার দক্ষতা ও মর্যাদা বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত সম্পৃক্ততা তৈরি এবং পেশাকে গতিশীল রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া সমীচীন।

অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, "৩৫ বছর বয়সের পর আইনজীবী হওয়ার পথ বন্ধ করার জন্য একটি উদ্যোগ নিতে বলেছি। অলরেডি এ নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।" বক্তৃতায় তিনি আইনজীবীদের পেশাজীবনের সঙ্গে সরকারি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের চাকরিজীবনের শুরুটা বেশ উজ্জ্বল হলেও আইনজীবীদের শুরুটা হয় নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। অনেক সরকারি কর্মকর্তা অবসরে গিয়ে আইন পেশায় যুক্ত হওয়ার কথা ভাবেন, কিন্তু দীর্ঘদিন এ পেশায় অভিজ্ঞ আইনজীবীদের সঙ্গে তখন মানিয়ে নেওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।

আইন পেশার সামাজিক মর্যাদা পুনর্গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন মন্ত্রী। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বর্তমান সমাজে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিসিএস ক্যাডার, ব্যাংকার কিংবা করপোরেট কর্মকর্তাদের তুলনায় বিয়ের বাজারে আইনজীবীদের চাহিদা কম। এ পেশার মর্যাদা ও সম্মান নতুন করে ফিরিয়ে আনতে আইনজীবীদের নিজেদেরই ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। আইনজীবীদের কেবল আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অর্থনীতি, রসায়ন, সমাজচুক্তি তত্ত্ব, নৃবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও শারীরস্থানের মতো নানা বিষয়ে সম্যক ধারণা রাখার পরামর্শ দেন তিনি। কারণ হিসেবে তিনি জানান, হত্যা মামলায় শারীরস্থানের জ্ঞান এবং আর্থিক বিরোধসংক্রান্ত মামলায় অর্থনীতির স্পষ্ট ধারণা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

আইনজীবীদের সমাজের ‘সামাজিক প্রকৌশলী’ হিসেবে অভিহিত করে মন্ত্রী বলেন, সমাজে সৃষ্ট নানা বৈষম্য ও ফাটল মেরামতে তাঁদের কাজ করতে হবে। রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি পেশাগত দক্ষতায় সমৃদ্ধ হওয়া এবং ভালো মানুষ হওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে বিচারকদের অসদাচরণের ক্ষেত্রে যেমন জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকে, আইনজীবীদেরও সেই জবাবদিহির আওতায় থাকা উচিত বলে মত দেন তিনি। আচরণবিধি থাকলেও তার সঠিক প্রয়োগ কম হওয়ায় পেশাগত নৈতিকতা নিশ্চিতে বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যানকে কঠোর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আইন পেশার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টে প্রতিদিন মামলা পরিচালনা ও বিভিন্ন আইনি সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে আইনজীবীরা যে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন, তা দিয়েই এআই-এর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

অনুষ্ঠানে তরুণ ইন্টার্নদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী উল্লেখ করেন, শিক্ষার কোনো কোডিফায়েড সীমা নেই; দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত অর্জিত প্রতিটি অভিজ্ঞতাই শিক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয় পার করে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে এসে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন, তা তাঁদের পুরো জীবনে অন্যতম সেরা সম্পদ হয়ে থাকবে।

‘এজিও–ইউএনডিপি ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম’-এর দ্বিতীয় ব্যাচের সমাপনী এবং তৃতীয় ব্যাচের নবীনদের বরণ উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী, ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিক্স ও বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin