যশোরের চাঁচড়ায় অবস্থিত ঐতিহাসিক শ্রীশ্রী দশমহাবিদ্যা মন্দিরে এক কিশোরীর আত্মহত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা ইসকনের সদস্যরা আত্মগোপনে চলে গেছেন। ১৭ বছর বয়সী শিপ্রা ঘোষের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী এই মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ একচ্ছত্রভাবে ইসকনের হাতে চলে যাওয়া এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদের চেষ্টা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় হিন্দুরা।
নিহত কিশোরীর পরিবার ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, শিপ্রা ঘোষের মৃত্যুর ঘটনায় তার ভাই পাপন ঘোষ বাদী হয়ে যশোরের আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় মন্দিরের অধ্যক্ষ অনুপম রায় ওরফে অপার গোবিন্দ দাসসহ আটজনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, অশালীন আচরণ এবং শিপ্রার মাকে মারধর করার অভিযোগ আনা হয়েছে। পরিবারের দাবি, এসব ঘটনার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েই শিপ্রা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। গত ২৭ সেপ্টেম্বর মামলাটি দায়েরের পর যশোরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সঞ্জয় পাল এ বিষয়ে থানায় কোনো মামলা হয়েছে কি না, তা জানতে চেয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
এদিকে মামলার পর থেকেই অভিযুক্ত অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ দাসসহ অন্য অভিযুক্তরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন। মন্দিরসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অভিযুক্তরা আত্মগোপনে যাওয়ার পর অভয়নগরের রূপ-সনাতন ধাম থেকে কয়েকজন নতুন সাধু এসে মন্দিরে অবস্থান নিয়েছেন। তবে এই নতুন সাধুদের পরিচয় বা তারা আদৌ বাংলাদেশি নাগরিক কি না, তা নিয়ে স্থানীয় সাধারণ হিন্দুদের মধ্যে সংশয় ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৬ সালে মন্দির সংস্কার ও পূজা-অর্চনায় সহযোগিতার কথা বলে স্থানীয় প্রভাবশালী হিন্দুদের অনুরোধে ইসকনকে এই মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু শর্ত ভেঙে ধীরে ধীরে পুরো মন্দিরের প্রবেশাধিকার, দানবাক্স, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং চত্বরের ব্যবস্থাপনা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় ইসকন। এমনকি মন্দিরে সাধারণ হিন্দুদের প্রবেশও সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি বিশ্বনাথ দত্ত অভিযোগ করেন, ইসকনকে যুক্ত করার সময় শর্ত ছিল তারা মন্দিরের মূল কার্যকলাপে হস্তক্ষেপ করবে না এবং তাদের কার্যক্রম চত্বরের একটি নির্দিষ্ট অংশে সীমাবদ্ধ থাকবে। প্রয়োজনে চত্বরের দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের বাইরে জমি কিনে পুনর্বাসন করার কথা থাকলেও তা মানা হয়নি। উল্টো ইতোমধ্যে তিনটি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং আরও বেশ কয়েকটি পরিবার উচ্ছেদের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। দানবাক্স ও মন্দিরের অনুদানের অর্থের ওপরও কমিটির কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই বলে জানান তিনি। তবে ইসকনের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
যশোর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন জানান, তিনি এখনো আদালতের কোনো নির্দেশনা পাননি এবং এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পুরো ঘটনাটি নিয়ে বর্তমানে মানবাধিকার সংগঠন 'রাইটস যশোর' তদন্ত শুরু করেছে। কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনা এবং মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগের কারণে এখন তদন্তের মুখে পড়েছে ইসকনের সামগ্রিক কার্যক্রম।
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৩: ০১আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৩: ০৬





