প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য জাপান সফরকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে একটি উচ্চাভিলাষী আঞ্চলিক যোগাযোগ ও শিল্প উন্নয়ন পরিকল্পনা করছে টোকিও। ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক 'দ্য হিন্দু'কে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, মাতারবাড়ী বন্দরকে ভিত্তি করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে বঙ্গোপসাগরীয় এলাকাকে যুক্ত করে একটি 'শিল্পমূল্য শৃঙ্খল' (ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভ্যালু চেইন) গড়ে তুলতে চায় তাদের দেশ। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক ও পরিবহন যোগাযোগ বৃদ্ধি করাই জাপানের মূল লক্ষ্য।
জাপানি ওই কূটনীতিকের মতে, মাতারবাড়ী বন্দর কেবল একটি অবকাঠামো নয়, বরং এটি বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শিল্পকেন্দ্রে রূপান্তরের পাশাপাশি ভৌগোলিক সংযোগ জোরদারে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরকে সামনে রেখে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য জাপানের নতুন আর্থিক সহায়তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সহায়তার আওতায় আসা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে মাতারবাড়ী শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগসমূহ। এই সফরের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত আগস্ট মাসে মাতারবাড়ী এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং প্রকল্পটির পরবর্তী পর্যায়ের কাজের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সার্বিক ধারণাসংগ্রহ করেন। নির্মাণ সম্পন্ন হলে মাতারবাড়ীই হবে বাংলাদেশের একমাত্র গভীর সমুদ্রবন্দর, যা চালু হলে বর্তমানে সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কার কলম্বো ও মালয়েশিয়ার বন্দরগুলোর ওপর থাকা বাংলাদেশের নির্ভরতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে।
টোকিওর মহাপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে, মাতারবাড়ী বন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা শিল্পমূল্য শৃঙ্খল দিয়ে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য সরাসরি বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারবে। এ ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মডেলকে উদাহরণ হিসেবে সামনে রাখছে জাপান। থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামকে একটি দক্ষিণ অর্থনৈতিক করিডর এবং সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে যুক্ত করে যেমন আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল, মাতারবাড়ীকে ঘিরেও ঠিক একই ধরনের মডেল বাস্তবায়ন করতে চায় টোকিও। জাপানের অর্থায়ন ও পরিকাঠামো পরিকল্পনায় তৈরি এ ধরনের করিডরের মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল ও মিয়ানমারের মধ্যকার আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ অনেক দূর এগিয়ে যাবে বলে মনে করছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে মাতাবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে বেশ দৃশ্যমান হয়েছে। শেখ হাসিনার আমলেই প্রকল্পের একটি বড় অংশের কাজ সম্পন্ন হয় এবং তখনকার অনুকূল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তিতে নদীকেন্দ্রিক বেশ কিছু সংযোগ প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ফেনী নদীর ওপর নির্মিত 'মৈত্রী সেতু', যা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি সংযোগ ঘটিয়েছে। এই সেতুটি পুরোদমে চালু করা সম্ভব হলে ভারতের উত্তর-পূর্ব অংশ থেকে চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী বন্দরে সহজে পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হতো। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সেতুটি এখনো চালু করা যায়নি।
তবে সাময়িক এই স্থবিরতা সত্ত্বেও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি গতিপথ ও সম্ভাবনার বিষয়ে আশাবাদী জাপানি কর্মকর্তারা। দ্য হিন্দুকে দেওয়া বক্তব্যে ওই কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর দিকে অবকাঠামোগত সংযোগ যত জোরদার হবে, মাতারবাড়ী বন্দরের সার্বিক কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব ততই বৃদ্ধি পাবে। উল্লেখ্য, এর আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে টোকিও যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। যদিও দুই দেশের তরফ থেকে সফরের চূড়ান্ত তারিখ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি, তবুও সফরকে কেন্দ্র করে দ্বিপক্ষীয় এজেন্ডা চূড়ান্ত করার কাজ এগোচ্ছে, যার মধ্যে 'মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ' (মিডি) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।





