তথ্যের অবাধ প্রবাহ কি আমাদের বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

Published: September 21, 2026, 4:20 am

একসময় খবরের জন্য সংবাদপত্র, রেডিও কিংবা টেলিভিশনের ওপর নির্ভর করতে হতো, কিন্তু বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের কল্যাণে মুহূর্তেই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের খবর হাতের মুঠোয় চলে আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আধুনিক মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠলেও, তথ্যের এই অবাধ প্রবাহ আমাদের সত্যের কাছাকাছি নেওয়ার পাশাপাশি বিভ্রান্তির এক নতুন জগতে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতা ও গতির ইতিবাচক দিক অস্বীকার করার উপায় নেই। জরুরি তথ্য আদান-প্রদান, হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত গঠন ও সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে এটি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এমনকি মূলধারার গণমাধ্যমে জায়গা না পাওয়া মানুষের কথাও এখানে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। তবে এই মাধ্যমের বড় সীমাবদ্ধতা হলো এখানে তথ্য প্রকাশের জন্য কোনো বাধ্যতামূলক সাংবাদিকতা, সম্পাদনা কিংবা যাচাই প্রক্রিয়া নেই। ফলে সত্য তথ্যের পাশাপাশি গুজব, মিথ্যা খবর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য একই গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় হাজার হাজার মানুষের শেয়ার বা মন্তব্যের কারণে মিথ্যা তথ্যকেও অনেকে সত্য বলে ভুল করেন।

মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাও এই বিভ্রান্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ব্যবহারকারীরা সাধারণত তাদের পূর্বধারণা বা বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে এমন তথ্যই সহজে গ্রহণ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী একই ধরনের কনটেন্ট বারবার সামনে নিয়ে আসে, যা মানুষকে একটি নির্দিষ্ট তথ্যবলয়ের মধ্যে আটকে ফেলে। এর ফলে ভিন্নমত বা ভিন্ন তথ্য তাদের চোখে পড়ে না, যা সমাজে পারস্পরিক সহনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং মতপার্থক্য বাড়িয়ে তোলে।

প্রযুক্তির বিবর্তনে বিভ্রান্তির এই ঝুঁকি এখন আরও জটিল রূপ নিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে এমন ছবি, ভিডিও কিংবা অডিও তৈরি করা হচ্ছে যা আসল-নকল পার্থক্য করা সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে 'ডিপফেক' প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক ঘটনা কিংবা ব্যক্তিগত পরিচয় বিকৃত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কনটেন্ট ভাইরাল করার নেশায় অনেক সময় অপসাংবাদিকরা চাঞ্চল্যকর শিরোনাম দিয়ে এআই-এর মাধ্যমে ভুয়া নিউজ ছড়িয়ে থাকে, যা ভবিষ্যতে জনমত প্রভাবিত করার বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের মতো দ্রুত ডিজিটালাইজেশনের পথে থাকা দেশে এই ঝুঁকি আরও বেশি। বিপুলসংখ্যক তরুণ ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়, যারা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি যাচাইহীন তথ্যের শিকার হচ্ছেন। কোনো গুজবকে কেন্দ্র করে সামাজিক উত্তেজনা তৈরি হওয়া কিংবা পুরোনো ছবি-ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির ঘটনা নিয়মিত ঘটছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বিভ্রান্তির কারখানা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করার উপায় নেই, কারণ মাধ্যমটির চেয়ে এর ব্যবহার পদ্ধতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, যা ছুরি ব্যবহারের মতো ভালো বা মন্দ উভয় কাজেই ব্যবহৃত হতে পারে। বর্তমান সময়ে এটি ছাড়া জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব। তাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন 'মিডিয়া লিটারেসি' বা গণমাধ্যম-সচেতনতা। কোনো খবর শেয়ার করার আগে তার উৎস যাচাই করা, প্রকাশের তারিখ দেখা, একাধিক নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে একই তথ্য নিশ্চিত হওয়া এবং সন্দেহজনক ছবি-ভিডিও সম্পর্কে সতর্ক থাকার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এই দায়বদ্ধতা কেবল ব্যবহারকারীর নয়, বরং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকেও নিতে হবে। তথ্যের অবাধ প্রবাহ তখনই আশীর্বাদ হবে, যখন তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি সমানভাবে শক্তিশালী হবে; অন্যথায় এই মাধ্যমটিই সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা মুছে দিতে পারে।

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০: ০৪আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০: ১৭

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh