গরমের দিনে এক গ্লাস লেবুর শরবতের সামনে বরফের টুকরা ছেড়ে দিলে কিছুক্ষণ পর দেখা যায় বরফ ছোট হয়ে আসছে আর পানীয়টি ঠান্ডা হচ্ছে। পানীয় ঠান্ডা হওয়ার এই প্রক্রিয়ায় বরফ কেবল নিজের ঠান্ডা ভাব ছড়িয়ে দেয় না, বরং পানীয় থেকে শক্তি শুষে নেয়। এই শক্তি আদান-প্রদানের ফলেই পানীয়ের তাপমাত্রা কমে এবং বরফ ধীরে ধীরে গলে পানিতে পরিণত হয়।
তাপ ও তাপমাত্রা এক বিষয় নয়। তাপমাত্রা হলো কোনো বস্তু কতটা গরম বা ঠান্ডা তার পরিমাপ, আর তাপ হলো শক্তি যা তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে প্রবাহিত হয়। স্বাভাবিক নিয়মে তাপ বেশি তাপমাত্রার বস্তু থেকে কম তাপমাত্রার বস্তুর দিকে প্রবাহিত হয়। ফ্রিজ থেকে বের করা বরফের তাপমাত্রা পানির চেয়ে অনেক কম থাকে। ফলে গরম পানিতে বরফ দিলে গরম পানীয় থেকে বরফের দিকে শক্তি প্রবাহিত হতে শুরু করে, যা পানীয়কে ঠান্ডা করে এবং বরফকে গলাতে থাকে। এই তাপ সঞ্চালনের প্রক্রিয়া ততক্ষণ চলে যতক্ষণ না উভয় বস্তুর তাপমাত্রা সমান হয়। তবে পানীয়টি শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামবে কি না তা নির্ভর করে বরফের পরিমাণ ও পানীয়ের প্রাথমিক তাপমাত্রার ওপর। বরফ যথেষ্ট পরিমাণে থাকলে মিশ্রণটি স্বাভাবিক চাপে শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
পদার্থের কণাগুলোর গতিশক্তির সঙ্গে তাপমাত্রার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গরম চায়ের কণাগুলো বরফের কণার তুলনায় গড়ে বেশি শক্তি নিয়ে নড়াচড়া করে। যখন চা ও বরফের সংস্পর্শ ঘটে, তখন চায়ের কণা শক্তি হারায় এবং বরফের কণা সেই শক্তি গ্রহণ করে। বরফের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পরও শক্তি গ্রহণ অব্যাহত থাকে। এই পর্যায়ে প্রাপ্ত শক্তির বড় একটি অংশ তাপমাত্রা বাড়ানোর পরিবর্তে বরফের অণুগুলোর নির্দিষ্ট বিন্যাস ভেঙে তাকে কঠিন থেকে তরল পানিতে পরিণত করতে ব্যয় হয়। এই দশা পরিবর্তনের সময় বরফের তাপমাত্রা প্রায় একই থাকে। বরফ গলতে প্রচুর তাপ শুষে নিতে পারে বলেই পানীয় দ্রুত ঠান্ডা হয়।
শক্তির নিত্যতা সূত্র অনুযায়ী, শক্তি কখনো ধ্বংস হয় না, কেবল এক রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তিত হয়। গরম পানীয় যে শক্তি হারায়, বরফ তা গ্রহণ করে। সেই শক্তির একাংশ বরফের তাপমাত্রা বাড়ায়, আর বড় অংশটি বরফকে পানিতে রূপান্তর করতে কাজে লাগে। তবে পানীয়টি বেশিক্ষণ ঠান্ডা থাকে না কারণ কক্ষের উষ্ণ বাতাস বা হাতের স্পর্শ থেকে শক্তি আবার পানীয়তে প্রবেশ করতে শুরু করে। বরফ পুরোপুরি গলে গেলে ধীরে ধীরে পানীয়ের তাপমাত্রাও বাড়তে থাকে। তাই গরমের দিনে ঠান্ডা পানীয়ের স্বাদ নিতে চাইলে বরফ দিয়ে বেশিক্ষণ ফেলে না রাখাই ভালো। গ্লাসে বরফের টুকরা ঘুরতে থাকা মানেই হলো বরফ পানীয় থেকে শক্তি শুষে নিচ্ছে।





