পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির আজারবাইজান, ইরাক ও উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া সফরের উদ্দেশ্যে আগামীকাল বুধবার ঢাকা ত্যাগ করবেন। ১০ দিনব্যাপী এই সফরে জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার, এশীয় আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মুসলিম বিশ্বের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বহুপক্ষীয় আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরাই তার মূল উদ্দেশ্য। আগামী ২৩শে অক্টোবর তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
সফরের প্রথম গন্তব্য আজারবাইজানের রাজধানী বাকু। সেখানে ১৫ই অক্টোবর এশিয়ায় পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থা প্রতিষ্ঠাবিষয়ক সম্মেলনের (সিআইসিএ) সপ্তম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এই সম্মেলনে সদস্যরাষ্ট্র, পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র এবং সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। এশিয়ায় সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা, শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া সম্মেলনটির অন্যতম লক্ষ্য। সিআইসিএর সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশ সুরক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সফরের দ্বিতীয় গন্তব্য ইরাকের রাজধানী বাগদাদ। সেখানে ১৭ ও ১৮ই অক্টোবর ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ৫২তম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, ফিলিস্তিন প্রশ্ন, মানবিক সংকট এবং অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতবিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম এটি। রোহিঙ্গা সংকটেও ওআইসি সদস্যদেশগুলোর সমর্থন বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। গত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বার্ষিক সমন্বয় সভায় হুমায়ুন কবির রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে সদস্যদেশগুলোর সহযোগিতা চেয়েছিলেন। বাগদাদের অধিবেশনেও ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ থাকবে।
সফরের শেষ পর্বে আলজেরিয়ায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্নের ফলে দেশের গ্যাস সরবরাহ ও আমদানি ব্যয় নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রচলিত সরবরাহকারীদের পাশাপাশি নতুন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে ঢাকা। আলজেরিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের বাজারে এলএনজি ও এলপিজি রপ্তানি করে আসছে এবং দেশটির ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল থাকায় সেখান থেকে জ্বালানি পরিবহনে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভর করতে হয় না।
গত ১০ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ও আলজেরিয়ার হাইড্রোকার্বনবিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ আরকাবের মধ্যে ভার্চ্যুয়াল বৈঠক হয়, যেখানে এলএনজি সরবরাহ ও হাইড্রোকার্বন খাতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১১ই অক্টোবর ঢাকায় আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আবদেলওয়াহাব সাইদানির সঙ্গে বৈঠকে জ্বালানিমন্ত্রী এলএনজি ও এলপিজি আমদানি নিয়ে সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারক এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন আলজেরিয়া সফরের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেন। এছাড়া গত ২০শে সেপ্টেম্বর হুমায়ুন কবির আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার খাতে সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ওষুধ, কৃষি, জাহাজ নির্মাণ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয় আলোচনায় আসে। তবে এই সফরে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক সই হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
গত জুলাইয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কাতারএনার্জি ২০২৬ সালে বাংলাদেশে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে আনার কথা জানিয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সম্ভাব্য ঘাটতি সামাল দিতে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে গ্যাস কেনা এবং অন্য সরবরাহকারীদের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার চুক্তির বিকল্প খতিয়ে দেখছিল বাংলাদেশ। গত বছর বাংলাদেশে আমদানি করা প্রায় ৭০ লাখ টন এলএনজির মধ্যে কাতার থেকে এসেছিল প্রায় ৪১ লাখ ৫০ হাজার টন। এলএনজির উচ্চমূল্য বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতেও চাপ তৈরি করেছে।





