সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোয় জটিলতা, বকেয়া প্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তা

Published: October 27, 2026, 7:56 am

নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী আগামী ১ নভেম্বর সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের চার মাসের বকেয়াসহ বেতন দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে বেতন নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দেওয়ায় অনেক সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারী এই সুবিধা সময়মতো না পাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৮ লাখ পেনশনভোগী ও ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের একটি বড় অংশ এখনো বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন করতে পারেননি। ফলে তারা পুরোনো কাঠামোতেই বেতন পাবেন এবং বকেয়ার টাকা পরে পাবেন।

নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন ও আবেদনগুলো পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বেতন নির্ধারণ করতে গিয়ে জ্যেষ্ঠতা ও গ্রেডের ক্রমে অসংগতি তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জুনিয়র কর্মকর্তারা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের চেয়ে বেশি বেতন পাচ্ছেন, আবার পদোন্নতির পরেও মোট আয় কমে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। অর্থ মন্ত্রণালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়; বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এ সমস্যা সমাধানে অর্থ বিভাগে আবেদন করলেও ১ নভেম্বরের আগে তা সুরাহা করা সম্ভব হচ্ছে না।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হয় এবং ৫ অক্টোবর থেকে বেতন নির্ধারণ শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, আইবাস++ ব্যবস্থার জটিলতা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে এই প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি, তবে অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে তারা প্রজ্ঞাপন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জানাশোনার ঘাটতি থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং তারা অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে অসংগতি দূর করার কাজ করছেন।

জাতীয় বেতনকাঠামো ২০২৬ অনুযায়ী, ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ ১২তম গ্রেডের তুলনায় ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ৭০০ টাকা বেশি। কিন্তু কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণের পর দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। ১১তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ২০১৫ সালের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা ৩০ জুন পর্যন্ত বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৬৬০ টাকা। নতুন কাঠামোর ২৫ হাজার টাকার সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে হয় ৩৬ হাজার ১৬০ টাকা, যা পরবর্তী ধাপ ৩৭ হাজার টাকায় নির্ধারিত হচ্ছে। অন্যদিকে ১২তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ২০১৫ সালের ১১ হাজার ৩০০ টাকা মূল বেতন ৩০ জুন পর্যন্ত বেড়ে ২৩ হাজার ৫৮০ টাকা হয়। নতুন কাঠামোর ২৪ হাজার ৩০০ টাকার সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে হয় ৩৬ হাজার ৫৮০ টাকা, যা পরবর্তী ধাপ ৩৭ হাজার ৭০০ টাকায় নির্ধারিত হচ্ছে। ফলে ১১তম গ্রেডের কর্মচারী ১২তম গ্রেডের চেয়ে ৭০০ টাকা কম পাচ্ছেন।

কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রথম পর্যায়ে ৫০ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন দাঁড়াবে ৩১ হাজার ২৩০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩১ হাজার ৫৯০ টাকা। অর্থাৎ ১২তম গ্রেডের কর্মচারী ৩৬০ টাকা বেশি পাবেন। ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৭৫ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের বেতন হবে ৩৫ হাজার ১৫ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩৫ হাজার ৫৯৫ টাকা, যেখানে ব্যবধান হবে ৫৮০ টাকা। ১ জুলাই ২০২৭ থেকে শতভাগ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের বেতন হবে ৪০ হাজার ৮০০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৪১ হাজার ৬০০ টাকা, তখন ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াবে ৮০০ টাকা।

পদোন্নতির ক্ষেত্রেও অসংগতি রয়েছে। দশম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা ১০ বছর চাকরি পূর্ণ করার পর নবম গ্রেডে পদোন্নতি পেলে মূল বেতন ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫১ হাজার টাকা হবে। কিন্তু দশম গ্রেডে ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা মূল বেতনের ওপর ৫০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা হয় ২৪ হাজার ৮৫০ টাকা। নবম গ্রেডে ৫১ হাজার টাকা মূল বেতনের ওপর ৪৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা হয় ২২ হাজার ৯৫০ টাকা। অর্থাৎ বাড়িভাড়া ভাতা কমবে ১ হাজার ৯০০ টাকা। ফলে মূল বেতন ১ হাজার ৩০০ টাকা বাড়লেও বাড়িভাড়া ভাতা ১ হাজার ৯০০ টাকা কমে যাওয়ায় মাসিক মোট আয় ৬০০ টাকা কমে যাবে।

উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময় নির্ধারণ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন কর্মচারীরা। ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যাঁদের চাকরির বয়স আট বছর পূর্ণ হয়েছে এবং যাঁদের ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে, তাঁরা উভয়েই ১ জুলাই থেকে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন। এতে একই গ্রেডের জ্যেষ্ঠ ও জুনিয়র কর্মকর্তার বেতন সমান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কর্মচারীরা দাবি জানিয়েছেন, অর্থ বিভাগ যেন বেতন নির্ধারণের নিয়ম, গ্রেডের ক্রম, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব পর্যালোচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় সংশোধন আনে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo