বাংলাদেশে বাড়ছে বিদেশি পর্যটক, কিন্তু কমছে পর্যটন আয়

Published: September 27, 2026, 3:48 am

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশ এখনো বড় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারেনি। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও এই খাত থেকে আয় উল্টো কমছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সাম্প্রতিক তথ্যে এই বৈপরীত্যের চিত্র উঠে এসেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ ২১ হাজার বিদেশি পর্যটক এসেছিলেন, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজারে। তবে পর্যটক বাড়লেও আয় কমে গেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ বিদেশি পর্যটন থেকে আয় করেছে প্রায় ৪৪ কোটি ডলার, যেখানে ২০২৩ সালে এই আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে দেশের পর্যটন সম্পদকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন পণ্যে রূপান্তর করা যাচ্ছে না。

আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে দেশের পর্যটন খাতের নানা সংকট ও সম্ভাবনার কথা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যেখানে ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ব্যয় ২ দশমিক ০২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং বৈস্মিক অর্থনীতিতে এই খাতের অবদান ১১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার, সেখানে বাংলাদেশ প্রচারণা, যোগাযোগ, অবকাঠামো ও দক্ষ জনবলের মতো মৌলিক সমস্যাতেই আটকে রয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ১ হাজার ২০০টিরও বেশি পর্যটনকেন্দ্র থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে এগুলোর কার্যকর প্রচার নেই। এছাড়া ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতাও বিদেশি পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করে। তবে সম্প্রতি সরকার ২০২৬ সালের মধ্যে নতুন ভিসা নীতি চূড়ান্ত করতে মন্ত্রিসভা পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে এবং অনলাইনে আগমন-বহির্গমন কার্ড পূরণের ব্যবস্থা চালু করেছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও একটি বড় বাধা। রাজধানী ঢাকার বাইরে সরাসরি আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ সীমিত হওয়ায় বিদেশি পর্যটকদের প্রথমে ঢাকায় এসে তারপর গন্তব্যে যেতে হয়। কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বারে রূপান্তরের আলোচনা চললেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এছাড়া দুর্গম পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানোর জন্য নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, নিরাপদ পানি ও জরুরি চিকিৎসার মতো পর্যটকবান্ধব অবকাঠামোর চরম অভাব রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, পরিবহন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো সমন্বিত পর্যটন করিডরের জন্য অপরিহার্য।

পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় প্যাকেজ বা 'অভিজ্ঞতা' তৈরির ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। কক্সবাজার, সুন্দরবন বা সিলেটের মতো স্থানে পর্যটকদের জন্য বৈচিত্র্যময় প্যাকেজ বা স্থানীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটানো যাচ্ছে না। পাশাপাশি দক্ষ ও বহুভাষিক গাইডের দীর্ঘদিনের সংকট এবং নিরাপত্তা বলতে শুধু পুলিশি পাহারা ভাবার মানসিকতাও এই খাতের ক্ষতি করছে। সেন্টমার্টিন, সুন্দরবন বা হাওরাঞ্চলের মতো সংবেদনশীল এলাকায় ধারণক্ষমতা নির্ধারণ না করে অপরিকল্পিত পর্যটনের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় অবশ্য আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো তৈরিতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। তবে সেজন্য করনীতি, ভূমি বরাদ্দ ও পরিবেশগত অনুমোদনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উপ-পরিচালক (প্রশাসন ও সমন্বয়) মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যমান পর্যটন ব্যবস্থা মূলত বেসরকারি খাত-কেন্দ্রিক, সরকার শুধু নীতি নির্ধারণ করে। তিনি সমন্বয়ের ঘাটতির কথা স্বীকার করে বলেন, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও জনবল সংকটের কারণে পর্যটন বোর্ডের ক্ষমতাও সীমিত। তবে পর্যটন খাতকে ঢেলে সাজাতে বোর্ড কাজ করছে। এই সংকট কাটাতে পর্যটন বোর্ড, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি খাতকে নিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin