ভোটার তালিকা থেকে দেদার নাম বাদ দেওয়া নিয়ে দেশজোড়া প্রতিবাদের মুখে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসি) নতুন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে যেখানে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) সম্পন্ন হয়েছে, সেখানে বাদ পড়া ভোটারদের মধ্য থেকে বৈধদের ফেরাতে বিশেষ অভিযান চালানো হবে। নতুন ভোটার এবং যারা নতুন করে নাম তুলতে চাইছেন, তাদের সঙ্গে ওই বৈধ ভোটারদের নামও তালিকায় তোলা হবে। বৃহস্পতিবার ভারতের নির্বাচন কমিশন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা শুক্রবার প্রকাশ্যে এসেছে। কমিশন জানিয়েছে, এই কাজ করবেন প্রতি রাজ্যের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা (ডিইও) ও ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ইআরও)।
এসআইআরের নামে নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম কেটে দিয়েছে। এই তালিকার মধ্যে রয়েছে মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিক জায়গায় নাম থাকা ব্যক্তি ও অবৈধ ভোটাররা। মৃত, স্থানান্তরিত ও একাধিক নাম থাকা ভোটারদের নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি নেই, তবে ‘অবৈধ’ ভোটার বলে দাগিয়ে যাঁদের নাম খারিজ করা হয়েছে, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার নিপুণভাবে এই কাজ করেছেন যাতে শাসক বিজেপি জয় নিশ্চিত করতে পারে। জ্ঞানেশ কুমারের কাজকর্মে অসন্তুষ্ট হয়ে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি গত ১০ মাসে ১৪ বার আপত্তি নথিভুক্ত করিয়েছেন। এই খবর প্রকাশ্যে আসার পর বিরোধীরা দেশজোড়া প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ শুরু করেছেন। জ্ঞানেশের অপসারণের দাবিতে বিরোধীরা সরব হয়েছেন এবং নাগরিক সমাজও আন্দোলনে নেমেছে। এই সার্বিক প্রতিরোধের মুখেই নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করা হচ্ছে।
কমিশনের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, শুধু বাদ পড়া ভোটাররাই যে আবেদন করবেন তা নয়, কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিইও, ইআরও ও মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদেরও খুঁজে দেখতে হবে এসআইআরের পরও কোনো বৈধ নাগরিকের নাম বাদ গেছে কি না। প্রয়োজনে তাঁদের বাড়িতে গিয়ে ফর্ম ৬ ভরিয়ে আবার নাম তুলতে হবে। নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, প্রতিটি রাজ্যে এসআইআরের আগের ও পরের তালিকা মিলিয়ে দেখতে হবে। মৃত, স্থানান্তরিত ও একাধিক আসনে নাম থাকা ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে, যাঁরা ওই তালিকায় পড়েন না, তাঁদের নাম কী কারণে বাদ গেছে তা বিচার করে দেখতে হবে। এখানে বিএলও বা ব্লক লেভেল অফিসারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। বৈধ মনে করলে তাঁরাই বাড়ি গিয়ে ফর্ম ৬ পূরণ করাবেন, যা নতুন করে নাম তোলার একমাত্র উপায়।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধীরা খড়্গহস্ত হওয়ার কারণ অনেক। এমনকি ইসির কাজ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিরাও বিভিন্ন সময় মন্তব্য করেছেন। বিরোধীদের অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমারের লক্ষ্য একটাই, যত বেশি সম্ভব বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া। এর ফলে দেখা যায়, যেসব রাজ্যে এসআইআর হয়ে গেছে, তা ২০২৬ সালের ভোটার তালিকাকে ২০১৫ সালের তালিকায় নামিয়ে এনেছে। অন্যভাবে বলা যায়, ২০২৬ সালে দেশের জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যা ২০১৫ সালের সমতুল্য হয়ে গেছে। এসআইআর হওয়া রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোতে ২০১৪ সালে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৭৬ কোটি ৬০ লাখ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ৯২ কোটি ৮০ লাখ। এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর আগে তা আরও বেড়ে হয় ৯৫ কোটি ২০ লাখ। এসআইআরের পর তৈরি খসড়া তালিকা দেখাচ্ছে, ওই ২০ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মোট বৈধ ভোটার কমে হয়েছে ৮১ কোটি ৭৯ লাখ, যা কিনা ২০১৫ সালের মোট ভোটার ৮১ কোটি ৬৯ লাখের চেয়ে মাত্র ১০ লাখ বেশি।
কয়েকটি রাজ্যে ভোটারের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে নাম কাটার অনুপাত বিস্ময়কর। মহারাষ্ট্রে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোট ও এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর মধ্যবর্তী সময়ে ভোটার বৃদ্ধি হয় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, অথচ খসড়া তালিকায় বাদ যায় ২১ শতাংশ ভোটারের নাম। গুজরাটে ভোটার বেড়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ অথচ বাদ যায় ১৪ শতাংশের নাম। তামিলনাড়ুতে ভোটার বৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৬ শতাংশ, বাদ গেছে ১৫ শতাংশের নাম। চণ্ডীগড়ে ভোটার সংখ্যা হ্রাস পেয়েছিল ২৭ শতাংশ, অথচ খসড়া তালিকায় বাদ যায় ৪০ শতাংশ ভোটার। নাগাল্যান্ডে ভোটার ৯ দশমিক ৬ শতাংশ কমে গিয়েছিল, খসড়া তালিকায় তা আরও কমে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে।
গত শুক্রবার দিল্লিতে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও লোকসভার সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করে এসআইআরের সমালোচনা করেন। তাঁরা পরিসংখ্যান দিয়ে দেখান, কীভাবে বেছে বেছে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট কাটা হয়েছে। মমতা দেখিয়েছেন, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে কলকাতা জেলায় তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিপক্ষের চেয়ে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৬৭৮ ভোট বেশি পেয়েছিল। ২০২৬ সালের এসআইআরে বাদ দেওয়া হয়েছে মোট ৬ লাখ ৯৭ হাজার ১৬০ ভোটারের নাম। উত্তর চব্বিশ পরগনায় তৃণমূলের জয়ের মার্জিন ছিল ৯ লাখ ১৩ হাজার ৯৪৩ ভোট, সেখানে বাদ দেওয়া হয়েছে ১২ লাখ ৬০ হাজার ৯৬ জনের নাম। নদিয়া জেলায় জয়ের মার্জিন ছিল ২০ হাজার ৯০৩, সেখানে বাদ গেছে ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৫৬৫ জন ভোটার। এভাবে হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, পশ্চিম মেদিনীপুরের হিসাব দাখিল করে মমতা বলতে চেয়েছেন, জ্ঞানেশ কুমারই পরিকল্পনা করে বিজেপিকে জয়ী করেছেন। বিরোধীরা এই প্রক্রিয়াকে অবাস্তব, অযৌক্তিক ও অসাংবিধানিক বলে মনে করছেন। সবচেয়ে বড় কথা, বিজেপি বারবার যে দাবি করে এসেছে অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গাদের নাম বাদ দিতে হবে, সেই দাবির কোনো হিসাব নির্বাচন কমিশন এখনো দাখিল করতে পারেনি। কত বিদেশি বা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী এসআইআরের পর বাদ গেছে, সেই খতিয়ান জ্ঞানেশ কুমারের কমিশন এখনো জানায়নি।





