বেহেশতে নারী-পুরুষের মেলামেশা ও সামাজিক সম্পর্কের স্বরূপ

Published: October 14, 2026, 7:16 am

বেহেশতের প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা করার সময় আমরা প্রায়ই পার্থিব জীবনের নিয়মকানুনের সঙ্গে পরকালের অলৌকিক জগতকে গুলিয়ে ফেলি। পৃথিবীতে আমরা যেসব সামাজিক নিয়ম, পর্দার বিধান কিংবা নারী-পুরুষের মেলামেশার নির্দিষ্ট সীমা মেনে চলি, তা মূলত পার্থিব জীবনের পরীক্ষা ও সুরক্ষার জন্য নির্ধারিত। কিন্তু বেহেশত পরীক্ষার কোনো জায়গা নয়, বরং ইমানদার বান্দাদের জন্য পার্থিব ভালো কাজের চূড়ান্ত পুরস্কারের আবাস। এই জগতটি সম্পূর্ণ অদৃশ্যের বা ‘গাইব’-এর জগত, যা পৃথিবীর ভৌত নিয়ম বা বায়োলজিক্যাল সীমাবদ্ধতা দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, বেহেশতে কি নারী ও পুরুষকে আলাদা রাখা হবে? কোরআনে বেহেশতের পুরস্কারের বর্ণনায় নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। মহান আল্লাহ বিশ্বাসী নারী ও পুরুষ উভয়কেই সমান মর্যাদা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সুরা নাহলের ৯৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, পুরুষ কিংবা নারীর মধ্যে যে কেউ ইমানদার অবস্থায় সৎকাজ করবে, আল্লাহ তাকে পবিত্র ও সুন্দর জীবন দান করবেন। একইভাবে সুরা গাফিরের ৪০ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে, ইমানদার নারী ও পুরুষ উভয়েই বেহেশতে প্রবেশ করবে এবং হিসাব ছাড়া রিজিক লাভ করবে। ইমাম ইবনে কাসির তাঁর ‘তাফসিরুল কুরআনিল আজিম’ গ্রন্থে (৪/৫৮৫) উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর কাছে ইমান ও আমলের বিচারে নারী-পুরুষের কোনো ভেদাভেদ নেই।

সুরা রহমানের ৭২ নম্বর আয়াতের তাবু বা প্রাসাদে অবস্থানকারী সঙ্গীদের বর্ণনার কারণে অনেকে মনে করেন নারীদের ঘরোয়া পরিবেশে বন্দি থাকতে হবে। এটি সঠিক নয়; বরং এটি রাজকীয় সম্ভ্রম ও ব্যক্তিগত সুরক্ষার একটি রূপক বর্ণনা মাত্র। বেহেশতে ‘মাহরাম’ বা ‘গাইরে মাহরাম’-এর মতো পার্থিব বিধান কার্যকর থাকবে না, কারণ এটি ইবাদতের স্থান নয়। সেখানে ইমানদার নারী তাঁর ইচ্ছামতো পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বান্ধবী কিংবা মারয়াম (আ.) বা খাদিজা (রা.)-এর মতো পুণ্যবতীদের সঙ্গে স্বাধীনভাবে দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারবেন। ইমাম নববি তাঁর ‘আল-মিনহাজ শারহু সহিহ মুসলিম’ (১৭/১৬৮) গ্রন্থে লিখেছেন, বেহেশতের জীবন পার্থিব বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত, ফলে সেখানে পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময়ে কোনো বাধা থাকবে না।

পৃথিবীতে নারী-পুরুষের মেলামেশার কড়াকড়ির পেছনে মানুষের ভেতরের মন্দপ্রবৃত্তি, দৃষ্টির পাপাচার ও হিংসা-বিদ্বেষের আশঙ্কা কাজ করে। কিন্তু বেহেশতে প্রবেশের আগেই ইমানদারদের অন্তর থেকে সমস্ত কলুষতা ধুয়ে-মুছে ফেলা হবে। সুরা হিজরের ৪৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আমি তাদের অন্তরে যে হিংসা-বিদ্বেষ ছিল তা দূর করে দেব; তারা ভাই ভাই হিসেবে মুখোমুখি আসনে হেলান দিয়ে বসবে।’ ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি তাঁর ‘মাফাতিহুল গাইব’ (১৯/১৬২, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮১) গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেছেন যে, বেহেশতে মানুষের মনস্তত্ত্ব সম্পূর্ণ বদলে যাবে এবং সেখানে কোনো বদনজর বা কামভাবের পাপাচার থাকবে না। ফলে সেখানে মেলামেশা বা কথাবার্তার মধ্যে কোনো কলুষতা থাকবে না এবং সবাই পরম আনন্দে সময় অতিবাহিত করবেন। সহিহ মুসলিমের ২৮২৪ নম্বর হাদিসে বর্ণিত আছে, আল্লাহ পুণ্যবান বান্দাদের জন্য এমন সব নেয়ামত প্রস্তুত রেখেছেন, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তরে কল্পনাও আসেনি। তাই অহেতুক সংশয় না করে নিজের ইমান ও আমলকে মজবুত করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

(ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৪/৫৮৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৪)সুতরাং পুরুষরা বেহেশতে যেসব আত্মিক ও মানসিক আনন্দ পাবে, নারীরাও হুবহু একই ধরনের স্বাধীনতা, সম্মান ও আনন্দ উপভোগ করবেন।.কেউ মনে করেন, বেহেশতে নারীদের ঘরোয়া পরিবেশেই থাকতে হবে এবং তারা পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না।

(ইমাম নববি, আল-মিনহাজ শারহু সহিহ মুসলিম, ১৭/১৬৮, দার আল-ইহইয়া আত-তুরাস আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৯৫)নারী-পুরুষের হৃদয়ের পরিশুদ্ধিপৃথিবীতে নারী-পুরুষের মেলামেশার ক্ষেত্রে যেসব কড়াকড়ি থাকে, তার পেছনে প্রধান কারণ হলো মানুষের ভেতরের মন্দপ্রবৃত্তি, দৃষ্টির পাপাচার এবং হিংসা-বিদ্বেষের আশঙ্কা।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo