দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলন নিষিদ্ধ করল মোদি সরকার

Published: October 17, 2026, 10:55 am

স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বিক্ষোভ প্রদর্শন পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। অশোক রোড, জনপথ এবং টলস্টয় রোডের সংযোগস্থলে গাছে ঘেরা এই অঞ্চলে আন্দোলনকারীদের আর জমায়েত হতে দেওয়া হবে না। সরকারের নতুন নির্দেশনায় আন্দোলনকারীদের বিকল্প স্থান হিসেবে দিল্লির কেন্দ্রস্থল থেকে যথাক্রমে ৪, ১২ ও ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রামলীলা ময়দান, সিবিডি গ্রাউন্ড অথবা বুরারির ময়দান বেছে নিতে বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে গত কয়েক দশক ধরে লন্ডনের হাইড পার্কের মতো অবস্থান গড়ে তোলা যন্তর মন্তরের আন্দোলন কেন্দ্রিক অধ্যায়ের অবসান ঘটতে যাচ্ছে।

অথচ এই যন্তর মন্তর কিন্তু রাজপথের আন্দোলনের জন্য তৈরি করা হয়নি। মূলত জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার উদ্দেশ্যে মরুরাজ্য রাজস্থানের জয়পুরের মহারাজা সোয়াই জয় সিং (দ্বিতীয়) ১৭২৪ থেকে ১৭৩৫ সালের মধ্যে ভারতের পাঁচটি শহরে একই ধরনের পাঁচটি মানমন্দির বা জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করেছিলেন। তৎকালীন ইউরোপে জেসুইট মিশনারিদের দৃষ্টিতে কোপার্নিকাস বা গ্যালিলিওর মতো বিজ্ঞানীরা ছিলেন ধর্মদ্রোহী। সেই সময়ে জয় সিং প্রথম মানমন্দিরটি স্থাপন করেন দিল্লিতে, এবং পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে জয়পুর, উজ্জয়িনী, বারানসি ও মথুরায় মানমন্দির গড়ে তোলেন। আকাশে সূর্য, চাঁদ, গ্রহ ও নক্ষত্রের গতিপথ পর্যবেক্ষণ, সময়ের নিখুঁত হিসাব ও পৃথিবীর ওপর এসবের প্রভাব পরিমাপই ছিল এগুলোর মূল উদ্দেশ্য।

কালের পরিক্রমায় মথুরার মানমন্দিরটি বিলুপ্ত হয়ে গেলেও বাকি চার শহরের স্থাপনাগুলো আজও পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে টিকে রয়েছে। 'যন্তর' শব্দটি এসেছে 'যন্ত্র' বা কাজের হাতিয়ার থেকে, আর 'মন্তর' এসেছে 'মন্ত্রণা' বা গণনার ধারণা থেকে। দিল্লির যন্তর মন্তরে মোট ১৩টি জ্যোতির্বিদ্যা-সংক্রান্ত স্থাপত্য রয়েছে। এর মধ্যে বড় রোদ্দুর ঘড়ি বা 'সানডিয়াল' ছাড়াও রয়েছে 'রাম যন্ত্র' (যার মাধ্যমে মহাকাশের বিভিন্ন জ্যোতিষ্কের উচ্চতা ও অবস্থান মাপা হয়), 'জয়প্রকাশ যন্ত্র' (সূর্যের রাশিচক্রে অবস্থান নির্ণায়ক) এবং 'সম্রাট যন্ত্র' (সূর্যের আলো-ছায়ার সাহায্যে সঠিক সময় নির্ধারণকারী)। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ১৯০১ সালে জয়পুরের মহারাজা রাম সিং তা সংস্কার করেন।

আধুনিক ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞানের এই স্থাপনাটি নব্বইয়ের দশকে এসে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। এর আগে ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে দাবি জানানোর প্রধান ক্ষেত্র ছিল 'বোট ক্লাব'। রাইসিনা হিলসে অবস্থিত রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনের প্রশস্ত পথ বিজয় চকে এসে মিশেছে, যা সোজা পৌনে তিন কিলোমিটার বিস্তৃত হয়ে ন্যাশনাল স্টেডিয়াম পর্যন্ত গেছে। ব্রিটিশ আমলে সড়কটির নাম 'কিংসওয়ে' থাকলেও স্বাধীনতার পর তা 'রাজপথ' হিসেবে পরিচিত হয়। সম্প্রতি নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে এই রাজপথের নাম বদলে রাখা হয়েছে 'কর্তব্য পথ', এবং রাষ্ট্রপতি ভবনের ভিতরের 'মোগল গার্ডেন'-এর নাম করা হয়েছে 'অমৃত উদ্যান'। রাজপথের দুই পাশের জলাধারে একসময় মানুষ প্যাডেল নৌকা চালাত বলেই এটি বোট ক্লাব নামে পরিচিত লাভ করে।

রাষ্ট্রপতি ভবন, সংসদ ভবন এবং নর্থ ও সাউথ ব্লকের কাছে অবস্থানের কারণে বোট ক্লাবই হয়ে উঠেছিল সরকারের কাছে জনগণের দাবি পৌঁছানোর সেরা মঞ্চ। ১৯৮৮ সালে পশ্চিম উত্তর প্রদেশের কৃষক নেতা মহেন্দ্র সিং টিকায়েতের নেতৃত্বে কয়েক লাখ কৃষক ৩৫ দফা দাবিতে বোট ক্লাব ও রাজপথে এক সপ্তাহ অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁবু, ট্রাক্টর ও গরুর গাড়ি নিয়ে আসা কৃষকদের দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত রাজীব গান্ধী সরকার নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়। এর পরের বছরই বোফর্স, ফেয়ারফ্যাক্স, সাবমেরিন কেলেঙ্কারি ও ঘুষের অভিযোগে রাজীব গান্ধী সরকারের বিরুদ্ধে বোট ক্লাবে বিশাল জনসভা করেন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং (ভি পি সিং), যার ধারাবাহিকতায় দিল্লির ক্ষমতায় পরিবর্তন আসে।

পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের ২১ মে তামিলনাড়ুর শ্রীপেরুমবুদুরে প্রথম দফার ভোট গ্রহণের পরদিন নির্বাচনী প্রচারে নিহত হন রাজীব গান্ধী। তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টি এন শেষন দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফার ভোট স্থগিত করেন। পরে জুনে নির্বাচনে জিতে নরসিংহ রাওয়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার গঠন করে। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর উদ্ভূত রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ১৯৯৩ সালে বোট ক্লাবে রাজনৈতিক সমাবেশ স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করে সরকার। তখনই বোট ক্লাবের বিকল্প হিসেবে কাছেই অবস্থিত যন্তর মন্তর আন্দোলনকারীদের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, আর রামলীলা ময়দান বড় রাজনৈতিক সমাবেশের জায়গা হিসেবে উঠে আসে।

গত তিন দশকে যন্তর মন্তর অসংখ্য ঐতিহাসিক আন্দোলনের সাক্ষী হয়েছে। ২০০৬ সালে মেধা পাটকর 'নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন'-এর অংশ হিসেবে এখানে ২০ দিন অনশন করেন। ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সুবিচারের দাবিতে মাসের পর মাস যন্তর মন্তরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নিয়েছিল। ২০১১ সালে প্রবীণ গান্ধীবাদী আন্না হাজারে তাঁর বিখ্যাত দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ও অনশন এখান থেকেই শুরু করেছিলেন। এছাড়া ২০১৫ সালে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যদের 'এক পদ এক পেনশন' আন্দোলন, ২০১৭ সালে ঋণ ও খরায় জর্জরিত তামিলনাড়ুর কৃষকদের ৪১ দিনের অনশন এবং ২০১৯ সালে বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) বিরোধী আন্দোলনের গোড়াপত্তন ঘটেছিল এই যন্তর মন্তরেই। ২০২৩ সালে অলিম্পিক পদকজয়ী কুস্তিগীররাও বিজেপি নেতা ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগে এখানেই অবস্থান ধর্মঘট করেন।

সম্প্রতি ককরোচ জন পার্টির (সিজেপি) জোরদার আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর ১২ বছরের শাসনামলে প্রথমবারের মতো পদক্ষেপে বাধ্য হয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ইস্তফা দেওয়ার নির্দেশ দেন। এই আন্দোলনের পরপরই মোদি সরকার যন্তর মন্তরকে আন্দোলনস্থল হিসেবে চিরতরে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এখন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সর্বোচ্চ আদালত যদি সরকারের এই নিষেধাজ্ঞাকে বহাল রাখে, তবে ক্ষমতার প্রাণকেন্দ্রের ঠিক সামনে গিয়ে জনগণের দাবি সনদ পেশ করার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে, যা ভারতের গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য একটি বড় আঘাত বলে মনে করা হচ্ছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo