ইইউর ‘সহযোগী সদস্য’ হওয়ার আমন্ত্রণ কানাডাকে, সার্বভৌমত্ব নিয়ে শঙ্কা

Published: September 18, 2026, 8:17 pm

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয় থেকে বের হয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ হওয়ার পথে এগোচ্ছে কানাডা। বুধবার ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন অত্যন্ত আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে কানাডাকে এই আমন্ত্রণ জানান। এর লক্ষ্য হলো উৎপাদন, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও জ্বালানি খাতকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কানাডাকে ওয়াশিংটনের পরিবর্তে ব্রাসেলসের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা। আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় একটি শীর্ষ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও সমঝোতা চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে এই সিদ্ধান্তকে কানাডার জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও হঠকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। কানাডার ৫১তম মার্কিন অঙ্গরাজ্য হওয়ার যেমন কোনো আগ্রহ নেই, তেমনি ইইউর অনানুষ্ঠানিক ২৮তম সদস্য হওয়ার চেষ্টাও দেশটির জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ থেকে উত্তর আমেরিকার বাণিজ্যিক জোট থেকে দূরত্ব বাড়াচ্ছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘মধ্যম শক্তিগুলোকে’ একজোট হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এই বিচ্ছিন্নতার ফলে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো—তিন দেশের জনগণই অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

যদিও ইইউ নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে, কিন্তু তাদের মুক্ত বাণিজ্যের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। জোটের অভ্যন্তরীণ একক বাজার ২৭টি সদস্য দেশকে বাণিজ্য সুবিধা দিলেও বাইরের দেশগুলোর ক্ষেত্রে ইইউর কঠোর সংরক্ষণবাদী নীতি রয়েছে। এছাড়া ইইউর বাইরের দেশগুলোকে যেকোনো বাণিজ্যিক চুক্তি ব্রাসেলসের মাধ্যমেই আলোচনা করতে হয়। এমতাবস্থায়, জাপান বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের সঙ্গে কানাডার সম্পর্কের ভবিষ্যৎ যদি আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে থাকা আমলাদের ওপর নির্ভর করে, তবে তা দেশটির জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

সার্বভৌমত্ব হারানোর এই শঙ্কা নিয়ে ইইউতে কানাডার মনোনীত রাষ্ট্রদূত জোনাথন উইলকিনসন জানিয়েছেন, সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিতে হয় এমন কোনো চুক্তিতে কানাডা কখনোই সম্মত হবে না। তবে কোনো জোটে যোগদানের ক্ষেত্রে সবসময়ই কিছু মূল্য দিতে হয়। ফন ডার লেয়েনের প্রস্তাবিত ‘প্রযুক্তি জোটের’ কারণে কানাডাকে হয়তো ইইউর কঠোর জেনারেল ডেটা প্রোটেকশন রেগুলেশন (জিডিপিআর) বা ডিজিটাল সার্ভিসেস ট্যাক্স গ্রহণ করতে হতে পারে। অথচ দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র তিন মাস পরই প্রধানমন্ত্রী কার্নি এই ধরনের একটি কর আরোপের পরিকল্পনা স্থগিত করেছিলেন।

এদিকে, ইইউর কঠোর বিধিনিষেধের কারণে অতীতেও অনেক দেশ পিছু হটেছে। গত মাসে আইসল্যান্ডের ভোটাররা ইইউতে যোগদানের আলোচনা শুরু করার সরকারি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তাদের আশঙ্কা ছিল যে ইউরোজোনের মাছ ধরার কোটা তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে। আইসল্যান্ডের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে এই খাত থেকে। মূলত ইইউ নিজেকে একটি ‘নিয়ন্ত্রক পরাশক্তি’ হিসেবে বিবেচনা করে এবং কঠোর বিধিনিষেধের মাধ্যমে জননীতির প্রায় সব ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, যা জাতীয় সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করে। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটও ছিল এই নিয়ন্ত্রণবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে একটি বড় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া।

কার্নির সঙ্গে ফন ডার লেয়েনের এই ঘনিষ্ঠতা মূলত ট্রাম্পের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্রদের দূরে সরে যাওয়ার বিষয়টিকেই স্পষ্ট করে। তবে রাজনৈতিক সম্পর্কের এই তিক্ততা স্থায়ী নাও হতে পারে। ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেবেন। ততদিনে পাল্টাপাল্টি শুল্কের ক্ষতিকর প্রভাব দুই দেশের সীমান্তেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। কিন্তু ততক্ষণে কানাডা হয়তো ব্রাসেলসের আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের জালে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin