আবরার হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে লাগতে পারে আরও ৫ বছর

Published: October 5, 2026, 7:11 pm

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখলেও উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে এখনও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। আসামিপক্ষের আইনজীবীদের আশঙ্কা, মামলার জট ও বর্তমান ধারাবাহিকতা অনুযায়ী আপিল নিষ্পত্তি হতে আরও ৪ থেকে ৫ বছর সময় লেগে যেতে পারে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন সাজা না পান এবং প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করাই তাদের মূল লক্ষ্য।

এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন ও মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলামের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াই চালানো জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু জানান, আপিল বিভাগের কার্যতালিকার জটলার কারণে শুনানি শুরু হতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। তিনি দাবি করেন, তাঁর মক্কেলরা সম্পূর্ণ নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও কারাগারে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। আইনজীবী দুলুর দাবি অনুযায়ী, মেফতাহুল ইসলাম জিয়নের হাতের লিগামেন্ট ছেঁড়া থাকায় শারীরিকভাবে তিনি অক্ষম ছিলেন এবং এই অবস্থায় কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। এছাড়া অপর আসামি মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম ঘটনার সময় রাজশাহীতে ছিলেন এবং সিআইডির সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে চিহ্নিত ২০ জনের তালিকাতেও তাঁর নাম ছিল না। চূড়ান্ত শুনানিতে তাঁরা ন্যায়বিচার পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন এই আইনজীবী।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যাতে অন্যায়ের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তিনি স্পষ্ট করেন যে, রাষ্ট্রপক্ষ কোনো মামলা অন্ধভাবে পরিচালনার পক্ষপাতী নয়। হাইকোর্টের রায়ের পর সংক্ষুব্ধ হয়ে আপিল বিভাগে যাওয়ার প্রাথমিক দায়িত্ব দণ্ডপ্রাপ্তদের, যেখানে রাষ্ট্রপক্ষ কেবল বিবাদী হিসেবে থাকে। ফলে শুনানি বিলম্বিত করার কোনো সুযোগ রাষ্ট্রপক্ষের নেই। আইনের শাশ্বত নীতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন নিরপরাধ ব্যক্তিও যেন সাজা না পান। বিচারক সংকট ও মামলার জটের কারণে নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হলেও জনগুরুত্বপূর্ণ এই মামলার দ্রুত শুনানির জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় তৎপর রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ৬ই অক্টোবর দিবাগত রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল (ইইই) বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখার পর ১৬ই মার্চ ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শেষে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, ভিন্নমত পোষণ কোনো অপরাধ নয় এবং political তকমা বা সন্দেহের বশে পিটিয়ে হত্যা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক আধিপত্য ও হলের ‘গেস্টরুম টর্চারের’ নৃশংস সংস্কৃতি বন্ধে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আবশ্যক। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই নৃশংসতা থামাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও হল কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাকেও আদালত সামগ্রিক ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলে উপস্থিত আসামিদের কেউ আবরারকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি বলেও আদালত উল্লেখ করেন।

দণ্ডপ্রাপ্তদের সবাই বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত নেতাকর্মী। মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ২০ আসামি হলেন—মেহেদী হাসান রাসেল, মো. অনিক সরকার, মেহেদী হাসান রবিন, ইফতি মোশাররফ সকাল, মো. মনিরুজ্জামান মনির, মো. মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মো. মাজেদুর রহমান মাজেদ, মো. মুজাহিদুর রহমান, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম তানভীর, হোসাইন মোহাম্মদ তোহা, মো. শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, মুনতাসির আল জেমি, মো. শামসুল আরেফিন রাফাত, মো. মিজানুর রহমান, এস এম মাহমুদ সেতু, মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম এবং মুজতবা রাফিদ। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকা ৫ জন হলেন—মুহতাসিম ফুয়াদ হোসেন, মো. আকাশ হোসেন, মুয়াজ আবু হুরায়রা, অমিত Saha এবং ইশতিয়াক আহমেদ মুন্না। এদের মধ্যে মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম এবং মুজতবা রাফিদ বিচারিক আদালতের রায়ের সময় থেকেই পলাতক রয়েছেন।

এদিকে ২০২৪ সালের ৬ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেয়াল টপকে পালিয়ে যান মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুনতাসির আল জেমি। পরবর্তীতে একই বছরের ৮ই সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের আদালতে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেন। আদালত তাঁর জামিন আবেদন নাকচ করে তাঁকে পুনরায় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

গত বছরের ১৬ মার্চ হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শেষে বিচারিক আদালতের রায় বহাল রেখে এ আদেশ দেন। তবে রায়ের পর উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে এখনও মামলাটির শুনানি সম্পন্ন হয়নি। আপিল নিষ্পত্তিতে আরও ৪-৫ বছর সময় লাগার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। অন্যদিকে, কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন সাজা না পান এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়—সে ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষের স্পষ্ট অবস্থানের কথা জানিয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin