যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইসরায়েলপন্থী লবির একচ্ছত্র প্রভাবে ভাঙন ও নতুন সমীকরণ

Published: November 8, 2026, 6:42 pm

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিতে ইসরায়েলের প্রতি দুই দলের দীর্ঘদিনের একচেটিয়া সমর্থনে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। গাজায় চলমান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আমেরিকানদের জনমতে বড় পরিবর্তনের পাশাপাশি সরাসরি নির্বাচনে শত শত কোটি ডলার ঢালতে গিয়ে চরম বিতর্কে পড়েছে ইসরায়েলপন্থী সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠন আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপ্যাক)। ঠিক এমন এক সময়ে মাঠে আবির্ভূত হয়েছে ফিলিস্তিনপন্থী নতুন অর্থায়নকারী রাজনৈতিক গোষ্ঠী ‘আমেরিকান প্রায়োরিটিজ’। সদ্য সমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই দুই লবিং গ্রুপের প্রভাব বিস্তারের লড়াই মার্কিন কংগ্রেসের রাজনীতিকে এক নতুন মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

এই নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের গোড়াপত্তন হয়েছিল নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক সমাজতন্ত্রী প্রার্থী জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক জয়ের পর। সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমোর বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে মামদানির সমর্থকেরা ‘নিউইয়র্কার্স ফর লোয়ার কস্টস’ নামের বিশেষ তহবিলের মাধ্যমে ৩৪ লাখ ডলারের বেশি ব্যয় করেছিলেন। নির্বাচনী প্রচারে মামদানি গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করেন এবং ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের টিকে থাকার অধিকার স্বীকারেও অস্বীকৃতি জানান। জয়ের পরদিনই ম্যানহাটনের সোহো এলাকায় মামদানির ধনকুবের অর্থদাতারা এক জরুরি বৈঠকে বসেন। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো নিয়ে নয়, বৈঠকে উপস্থিত সাতজন বড় দাতার মূল আলোচনার বিষয় ছিল ইসরায়েলবিরোধী যে জনসমর্থন তৈরি হয়েছে, তাকে কীভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া যায়।

বৈঠকে উপস্থিত থাকা প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও ধনী মুসলিম ব্যবসায়ীরা সিদ্ধান্ত নেন, মামদানির জয় প্রমাণ করে মার্কিনদের জনমত বদলে যাচ্ছে। তারা কংগ্রেসের বিভিন্ন আসনের প্রাথমিক নির্বাচনে এই একই কৌশল ব্যবহারের পরিকল্পনা করেন। সেদিনই বৈঠকে একজন ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার, একজন ৫০ হাজার ডলার এবং অন্য একজন ৫ লাখ ডলার দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। এভাবে এক দিনেই মোট ৪৫ লাখ ডলার অনুদানের প্রতিশ্রুতি মেলে। এই অর্থকে ভিত্তি করেই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘আমেরিকান প্রায়োরিটিজ’। সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ঠিক হয় যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের জন্য সামরিক সাহায্য বন্ধের জনমত তৈরি করা এবং সেই অর্থ আমেরিকার অভ্যন্তরীণ উন্নয়নে ব্যয়ের দাবি তোলা।

অপরদিকে, ১৯৫০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এআইপ্যাক দীর্ঘ কয়েক দশক প্রকাশ্যে প্রার্থী নির্বাচন ও অর্থ বিতরণ থেকে দূরে ছিল। ঐতিহ্যগতভাবে তারা দুই দলের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে নীতিগত যোগাযোগ রক্ষা করত, যাতে ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থন অব্যাহত থাকে। এমনকি কোনো প্রার্থীর প্রচারণায় সংগঠনের কর্মীদের অংশ নেওয়া বা প্রার্থীর মূল্যায়ন করাও নিষিদ্ধ ছিল, যাতে ইসরায়েল ইস্যুতে দলীয় সংঘাত তৈরি না হয়। কিন্তু ২০১৫ সালে বারাক ওবামার মেয়াদে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির পর ডেমোক্র্যাটদের ভেতরে বিভক্তি স্পষ্ট হয়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও রিপাবলিকানরা চুক্তির বিরোধিতা করলে সে বছর কংগ্রেসে নেতানিয়াহুর ভাষণ বয়কট করেন বহু ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা।

২০১৮ সালে কংগ্রেসের প্রগতিশীল নতুন আইনপ্রণেতারা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ওই বছর পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে দেখা যায়, ডেমোক্র্যাটদের মাত্র ২৭ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের চেয়ে ইসরায়েলের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল, যা ১৯৭৮ সালের পর সর্বনিম্ন। বিপরীতে রিপাবলিকানদের মধ্যে এই হার ছিল ৭৯ শতাংশ। রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়তে থাকায় ২০২১ সালে নীতি পরিবর্তন করে সরাসরি নিজস্ব তহবিল ও ‘ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক প্রজেক্ট’ নামের সুপার প্যাক গঠন করে এআইপ্যাক। পরবর্তী দুটি নির্বাচনী চক্রে সংস্থাটি ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার খরচ করে। ২০২২ সালে তারা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী বাছাইয়ের ৯টি প্রতিযোগিতায় ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার ব্যয় করে ৭টিতে নিজেদের সমর্থিত প্রার্থীকে বিজয়ী করে আনে।

নর্থ ক্যারোলাইনার প্রাথমিক নির্বাচনে প্রগতিশীল মুসলিম নারী নিদা আল্লামের বিরুদ্ধে এআইপ্যাকের অর্থায়ন ছিল সবচেয়ে চর্চিত ঘটনা। বার্নি স্যান্ডার্সের সাবেক সহযোগী আল্লাম অভিযোগ করেছিলেন, এআইপ্যাক বিশেষভাবে হিজাব পরা ও মুসলিম নারী প্রার্থীদের লক্ষ্যবস্তু করছে। ওই নির্বাচনে এআইপ্যাকের সহযোগী তহবিল ২১ লাখ ডলার ঢালে প্রার্থী ভ্যালেরি ফুশের পেছনে, যা ফুশের নিজস্ব তহবিলের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ ছিল। শেষ পর্যন্ত ফুশে ১০ শতাংশ ব্যবধানে জয় পান। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং পরবর্তী সময়ে গাজায় ইসরায়েলের ধ্বংসাত্মক সামরিক পদক্ষেপ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে বিরোধকে চরমপর্যায়ে নিয়ে যায়।

২০২৪ সালের নির্বাচনে এআইপ্যাকের বিশেষ তহবিল প্রায় ৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলার ব্যয় করে, যার বড় অংশই ব্যবহার করা হয় গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদকারী ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের নির্বাচনে হারানোর জন্য। কেবল নিউইয়র্কের একটি রেসেই তারা খরচ করে ১ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। অথচ রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে তারা খরচ করে মাত্র ৩০ লাখ ডলার। তবে ২০২৫ সালে এসে দলীয় এই বৈপরীত্য গভীর আকার ধারণ করে। এআইপ্যাক-সমর্থিত ভ্যালেরি ফুশে ২০২৪ সালে ইসরায়েল সফরে গিয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ছবি তুললে নিজের এলাকাতেই মারাত্মক সমালোচনার মুখে পড়েন। গণঅসন্তোষের মুখে ফুশে ইসরায়েলে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি সীমিত করার প্রস্তাবে সই করেন এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনে এআইপ্যাকের অনুদান না নেওয়ার ঘোষণা দেন। জবাবে এআইপ্যাকও তার ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়।

এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নর্থ ক্যারোলাইনার ওই নির্বাচনে নিদা আল্লামের পক্ষে ১০ লাখ ডলারের বেশি ব্যয় করে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম আমেরিকান প্রায়োরিটিজ। ফুশে শেষ পর্যন্ত মাত্র এক হাজার ভোট বা ১ শতাংশের কম ব্যবধানে জয়ী হলেও আমেরিকান প্রায়োরিটিজ পিছু হটে নি। তারা কম খরচে বেশি প্রভাব ফেলার কৌশল নেয়। একই দিনে টেক্সাসে মাত্র ১ লাখ ডলার ব্যয় করে তাদের সমর্থিত প্রার্থী ফ্রেডেরিক হেইনস তৃতীয় জয় পান। এরপর মিশিগান, নিউ জার্সি, নিউইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, ক্যালিফোর্নিয়া, ডেনভার ও মিনেসোটায় তারা অর্থ ঢালে। মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট আব্দুল এল-সায়েদের পক্ষে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ডলার ব্যয় করে আমেরিকান প্রায়োরিটিজ এবং হ্যালি স্টিভেনসকে হারিয়ে এল-সায়েদ জয়লাভ করেন।

আমেরিকান প্রায়োরিটিজের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ১ কোটি ডলারের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তারা সংগৃহীত প্রায় ৮০ লাখ ডলার খরচ করে ব্যাপক সাফল্য পায়। প্রধান অর্থদাতাদের একজন, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা মোহাম্মদ ওয়াকাস জাভেদ ১০ লাখ ডলার অনুদান দিয়ে জানান, এআইপ্যাকের মতো বিপুল অর্থ তাদের ছিল না, তবে কৌশলগত আসনে সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই তারা সমীকরণ বদলে দিয়েছেন। আগামী কংগ্রেসে তাদের সমর্থিত ১৩ জন সদস্য (১১ জন প্রতিনিধি পরিষদ ও ২ জন সিনেটর) যোগ দিতে যাচ্ছেন। অন্যদিকে এআইপ্যাক সম্প্রতি চরম প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশের অজুহাত দেখিয়ে প্রার্থীদের সরাসরি প্রকাশ্যে সমর্থন জানানোর পথ থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে, যদিও তাদের সুপার প্যাক ও ব্যক্তিগত ডোনেশন সুবিধা চালু থাকবে।

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক নীতি বিশ্লেষক জোয়েল রুবিন উল্লেখ করেছেন, নির্বাচনী রাজনীতিতে সরাসরি টাকা ঢালার এই মাত্র পাঁচ বছরের পুরোনো কৌশল এআইপ্যাকের দীর্ঘদিনের গ্রহণযোগ্যতা ও কংগ্রেসে প্রভাব দুটোই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এমনকি রিপাবলিকানদের শীর্ষ পর্যায়েও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছরের মধ্যে ইসরায়েলকে দেওয়া বার্ষিক ৪০০ কোটি ডলারের সাহায্য বন্ধের ইঙ্গিত দিয়েছেন। নির্বাচনের পরদিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের প্রত্যাশিত ফল না হওয়ার জন্য ইরান যুদ্ধ ও ইসরায়েল নীতিকে দায়ী করেছেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান শাপিরোর মতে, ইসরায়েলকে একতরফা সাময়িক সহায়তার দিন শেষ হয়ে আসছে। এখন থেকে পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপন, ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা, গাজা পুনর্গঠন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে মার্কিনদের না জড়ানোর বিষয়গুলো ওয়াশিংটনে প্রধান শর্ত হিসেবে সামনে আসবে। যদিও এআইপ্যাক দাবি করেছে তারা এবারও ২৯০ জন ইসরায়েলপন্থী প্রার্থীকে জেতাতে এবং ২৯ জন সমালোচককে হারাতে পেরেছে, তবে ভ্যালেরি ফুশের মতো বহু রাজনীতিককে এখন ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ফিলিস্তিনপন্থী শক্তিশালী জনমতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। মামদানির সেই সোহো বৈঠকের মাধ্যমে শুরু হওয়া ক্ষুদ্র উদ্যোগটি আজ মার্কিন রাজনীতির অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে বিশাল এক পরিবর্তন এনে দিয়েছে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin