বিশ্ব বিজ্ঞান একাডেমি টিডব্লিউএএসের ফেলো নির্বাচিত হলেন বাংলাদেশের ৭ বিজ্ঞানী

Published: November 8, 2026, 12:05 pm

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অঙ্গনে বাংলাদেশের গবেষকদের ভাবমূর্তি ও প্রতিনিধিত্ব আরও উজ্জ্বল হলো। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণার অগ্রগতিতে কাজ করা শীর্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্য ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্সেস (TWAS) ২০২৭ সালের নতুন ফেলো হিসেবে বাংলাদেশের সাতজন বিজ্ঞানীকে নির্বাচিত করেছে। সংস্থাটি ২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর বিশ্বজুড়ে ৮৭ জন নতুন ফেলো নির্বাচনের ঘোষণা দেয়, যার মধ্যে ৫৮ জন পুরুষ ও ২৯ জন নারী বিজ্ঞানী রয়েছেন। নির্বাচিতদের ৭৭ জন উন্নয়নশীল বিশ্বের। এর মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা বিশ্বের ৬৬টি চিহ্নিত দেশ থেকে ১৫ জন ফেলো মনোনীত হয়েছেন, যাঁদের সাতজনই বাংলাদেশের। ফেলো নির্বাচিত গবেষকেরা আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে একাডেমিতে অন্তর্ভুক্ত হবেন।

বিশ্ব বিজ্ঞান একাডেমি বা TWAS-এর ২০২৭ সালের নতুন ফেলো হিসেবে স্থান পাওয়া বাংলাদেশের সাত বিজ্ঞানী হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুন নাহার, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ববিদ মোহাম্মদ আবদুল লতিফ (পরিচালক, রাইস রিসার্চ সেন্টার, সুপ্রিম সিড কোম্পানি লিমিটেড, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ; সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুর রশীদ, বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ খান (সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও মহাপরিচালক, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিএসই বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সোহেল রহমান এবং বুয়েটের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ. কে. এম. আখতার হোসেন।

ফেলো নির্বাচনের পাশাপাশি সংস্থাটি থেকে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এসেছে বাংলাদেশে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুন নাহার লাভ করেছেন মর্যাদাপূর্ণ ‘টিডব্লিউএএস ফায়জাহ এম. আল-খারাফি পুরস্কার’ (TWAS Fayzah M. Al-Kharafi Award)। উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর নারী বিজ্ঞানীদের উৎসাহিত করতে প্রতিবছর ঘূর্ণায়মান বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রের ভিত্তিতে এই সম্মাননা দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারিত ক্ষেত্র ছিল কৃষিবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান। এই আন্তর্জাতিক পুরস্কারের অর্থমূল্য ৪ হাজার মার্কিন ডলার। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী অধ্যাপক ফিরদৌসী কাদরী নির্বাচিত হয়েছেন TWAS কাউন্সিলের পর্ষদ সদস্য। তিনি মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধি হিসেবে ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৮ পর্যন্ত দুই বছর মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবেন। সংস্থাটির পলিসি ও সিদ্ধান্ত নির্ধারণী ১৫ সদস্যের নতুন কাউন্সিলে ১১ জন নারী এবং ৪ জন পুরুষ সদস্য রয়েছেন।

ইতালির ত্রিয়েস্তে শহরে সদর দপ্তর অবস্থিত দ্য ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্সেস ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স ইন ডেভেলপিং কান্ট্রিজ (TWAS) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৩ সালে। নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালামসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের একঝাঁক প্রথিতযশা বিজ্ঞানী এটি প্রতিষ্ঠা করেন, যা জাতিসংঘের ইউনেসকোর একটি বিশেষ কর্মসূচি হিসেবে পরিচালিত হয়। TWAS-এর ফেলোশিপ কেবল এক বছরের কোনো সাময়িক পদবি নয়, বরং এটি বিজ্ঞানীদের আজীবন মেয়াদি সদস্যপদের বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি। গবেষণার মান, বৈজ্ঞানিক অবদান এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিচার করেই এই ফেলো নির্বাচিত করা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের মাটির নিচের পানিতে আর্সেনিক দূষণ প্রতিরোধ ও সুপেয় পানির নিরাপত্তায় চার দশক ধরে কাজ করে চলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাইড্রোজিওলজিস্ট বা ভূগর্ভস্থ পানিবিজ্ঞানী অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ। তিনি ভূগর্ভস্থ পানির সম্পদ, আর্সেনিকের ঘনত্ব ও উপকূলীয় এলাকার পানির লবণাক্ততা কমাতে গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গবেষণাজীবনে তিনি ২৫০টির বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। TWAS-এর বিবরণ অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রেফারেন্স পাওয়া শীর্ষ ২ শতাংশ গবেষকের মধ্যে স্থান করে নেওয়া অধ্যাপক আহমেদের কাজ জাতীয় নীতি এবং আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য উদ্যোগগুলোতে বাস্তব প্রভাব ফেলছে।

কৃষিবিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের জন্য একই সঙ্গে ফেলোশিপ ও TWAS ফায়জাহ এম. আল-খারাফি পুরস্কার পাওয়া অধ্যাপক কামরুন নাহার প্রতিকূল পরিবেশে ফসলের টিকে থাকার উপায় নিয়ে গবেষণা করছেন। উদ্ভিদ শারীরতত্ত্ববিদ হিসেবে তিনি উদ্ভিদের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রতিরক্ষা এবং কোষে মিথাইলগ্লাইঅক্সাল নামক ক্ষতিকর উপাদান নিষ্ক্রিয়কারী গ্লাইঅক্সালেজ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেন। এছাড়া অল্প খরচে খনিজ উপাদান ও সংকেতবাহী অণু ব্যবহার করে প্রতিকূল পরিবেশে ধানের ফলন ধরে রাখার কৌশল বের করেছেন তিনি। স্ট্যানফোর্ড-এলসেভিয়ার তালিকায় বিশ্বমানের ২ শতাংশ গবেষকের তালিকাভুক্ত অধ্যাপক নাহারের h-index ৭৭ এবং তাঁর গবেষণার রেফারেন্স সংখ্যা ২৪ হাজারের বেশি। তিনি বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত সদস্য, ২০টি গবেষণা গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন এবং ৪০টির বেশি আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে নিবন্ধ লিখেছেন।

ধানের ফলন ও সুরক্ষা বৃদ্ধিতে দীর্ঘ অবদান রাখছেন উদ্ভিদ রোগতত্ত্ববিদ মোহাম্মদ আবদুল লতিফ। তিনি ধানের ব্লাস্ট, ব্যাকটেরিয়াল ব্লাইট ও টুংরো রোগের প্রতিরোধক জিন এবং কিউটিএল (QTL) শনাক্ত করেছেন। ডিএনএ মার্কার-সহায়তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনি জিঙ্কসমৃদ্ধ ব্রি ধান১০০ সহ ২৫টি উচ্চফলনশীল ধানের জাত তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে ন্যানোকণার সাহায্যে রোগের প্রতিষেধক এবং ক্রিসপার ক্যাস৯ (CRISPR-Cas9) প্রযুক্তিতে জিনোম সম্পাদনা নিয়ে কাজ করছেন এই বিজ্ঞানী, যার পিয়ার-রিভিউড সাময়িকীতে ১৯১টি গবেষণাপত্র রয়েছে।

প্রাকৃতিক উৎস থেকে ওষুধ আবিষ্কারের গবেষণায় আন্তর্জাতিক ভূমিকা রাখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুর রশীদ। প্রাকৃতিক যৌগবিষয়ক এই রসায়নবিদ প্রাকৃতিক উদ্ভিদ, অণুজীব ও সামুদ্রিক প্রাণী থেকে ২০০টির বেশি জৈব সক্রিয় অণু পৃথক করেছেন, যার ৭০টি বিশ্ববিজ্ঞানে সম্পূর্ণ নতুন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায় তাঁর চিহ্নিত একাধিক উপাদানের ক্যানসার ও এইচআইভি প্রতিরোধী কার্যকারিতা পাওয়া গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ মূল্যায়নে স্কোপাসভিত্তিক তথ্যে সর্বোচ্চ অবদানকারী হিসেবে শীর্ষস্থান পাওয়া অধ্যাপক রশীদের প্রকাশিত নিবন্ধ ৬২০টির বেশি (৩১৫টি স্কোপাস সূচিবদ্ধ)। ১০ হাজার ৮০০ বারের বেশি উদ্ধৃত হওয়া এই বিজ্ঞানীর h-index ৪৮। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের তিন মেয়াদের ডিন এবং বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের সাবেক সহসভাপতি।

প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ প্রতিরোধে পাটের সেলুলোজ থেকে পেটেন্টকৃত 'সোনালি ব্যাগ' উদ্ভাবন করে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ খান। TWAS-এর মূল্যায়নে সোনালি ব্যাগকে পরিবেশবান্ধব, একবার ব্যবহারযোগ্য বায়োপলিমার এবং প্লাস্টিকমুক্ত কার্বন-নেগেটিভ উদ্ভাবন বলে অভিহিত করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ নীতিতেও ভূমিকা রেখেছে। তিনি বায়োপলিমার, ন্যানোসেলুলোজ, চিকিৎসাসামগ্রী, টেক্সটাইল প্রযুক্তি এবং আবাসন উপকরণ নিয়েও গবেষণা করেছেন। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের এই সাবেক মহাপরিচালক ২০২৪ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার, ২০২০ সালে ‘এমআইটি সলভ’ স্বীকৃতি এবং পলিমার গোল্ড মেডেল লাভ করেন।

তাত্ত্বিক কম্পিউটার বিজ্ঞান ও অ্যালগরিদম গবেষণায় নজরকাড়া সাফল্য দেখিয়েছেন বুয়েটের অধ্যাপক মোহাম্মদ সোহেল রহমান। তিনি স্ট্রিং অ্যালগরিদম, কম্বিনেটরিক্স, সিকোয়েন্স অ্যানালাইসিস এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) প্রয়োগ নিয়ে কাজ করেন। এক্স-রে ও এমআরআই ইমেজে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও টিস্যুর সীমানা নিখুঁত করার জন্য তাঁর উদ্ভাবিত 'MultiResUNet' এআই মডেল চিকিৎসা বিজ্ঞানে বহুল ব্যবহৃত। তাঁর অধীনে পরিচালিত শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াড ইন ইনফরমেটিক্স (IOI) ও আইসিপিসি (ICPC) প্রতিযোগিতায় সফলতা অর্জন করেছেন। তিনি ২০২৩ সালে আর্থ সায়েন্স ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড, ২০২৫ সালে জনস হপকিন্স হেলথকেয়ার ডিজাইন কম্পিটিশন চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ২০১৭ সালে জাতীয় আইসিটি পুরস্কার অর্জন করেন।

পদার্থবিজ্ঞানের সলিড-স্টেট ফিজিকসে টানা প্রায় তিন দশক ধরে গবেষণা চালিয়ে আসছেন বুয়েটের অধ্যাপক এ. কে. এম. আখতার হোসেন। বহুগুণসম্পন্ন চৌম্বকীয় পদার্থ (মাল্টিফেরয়িকস), সুপারকন্ডাক্টর, ন্যানো-কাঠামো উপাদান, সিসামুক্ত পেরোভস্কাইট সৌরকোষ ও হাইড্রোজেন সংরক্ষণ প্রযুক্তি নিয়ে তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত। কম্পিউটেশনাল কোয়ান্টাম ডেনসিটি ফাংশনাল থিওরি (DFT) ব্যবহারে দক্ষ এই বিজ্ঞানীর ২৮০টির বেশি নিবন্ধ ও ৩৭ h-index রয়েছে। তিনি ১৩ জন পিএইচডি ও ৪৮ জন এমফিল গবেষককে পথ দেখিয়েছেন। কমনওয়েলথ ও জেএসপিএস ফেলো অধ্যাপক হোসেন বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ভৌতবিজ্ঞান স্বর্ণপদক পান।

বাংলাদেশের জন্য এই বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি কেবল গবেষকদের স্বতন্ত্র সাফল্য নয়; বরং এটি নিরাপদ পানীয় জল, খাদ্যের সুরক্ষা, টেকসই কৃষি, নতুন ওষুধের উদ্ভাবন, প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচ্ছন্ন রূপান্তর শক্তির ক্ষেত্রে দেশীয় গবেষণার বৈশ্বিক গুরুত্ব প্রমাণ করে। মৌলিক গবেষণার সব ফল রাতারাতি বাজারে পাওয়া না গেলেও আন্তর্জাতিক ফোরামে বিশ্ব বিজ্ঞান একাডেমির এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের তরুণ গবেষক ও সামগ্রিক বিজ্ঞান চর্চায় নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে। এই প্রতিবেদনের তথ্যাদি TWAS.org, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo